ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬ 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে পাকিস্তানি গণহত্যার স্বীকৃতি দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২০:৩৮, ২৬ মার্চ ২০২৬

শেয়ার

বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে পাকিস্তানি গণহত্যার স্বীকৃতি দাবি

অভিশপ্ত ২৫ মার্চ। গণহত্যা দিবস। আন্তর্জাতিক দুনিয়া এখনও স্বীকৃতি না দিলেও দু’দিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রে সংসদ সদস্য গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান সংসদের নিম্নকক্ষে একাত্তরের গণহত্যার স্বীকৃতি চেয়েছেন। তিনি তুলে ধরেছেন পাকিস্তানি বর্বরতার বিবরণ। ল্যান্ডসম্যান বোঝালেন বিদেশীরাও ভোলেনি গণহত্যার বিভৎসতা। বাংলাদেশের মানুষ চাইলেও কিছুতেই ভুলতে পারবে না সেই দুঃস্বপ্নের দিনলিপি। রাজাকার, আল-বদরদের মতোই জামায়াতকেও তারা তাই কিছুতেই ক্ষমা করতে পারে না। সেটা বুঝেই এখন জামায়াতে ইসলামীর মতো স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি মহান স্বাধীনতা দিবস পালন করতে বাধ্য হয়েছে।

জামায়াতকে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারে না। কারণ একাত্তরের ঘাতক বাহিনীর সঙ্গে আজও রয়েছে জামায়াতের বন্ধুত্ব। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে তাই মহান স্বাধীনতার ঘোষক, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল ভোটে জয়ী হয়। প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন শহীদ জিয়া ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান তারেক রহমান।

স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, ‘মেজর জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা-বিভ্রান্ত ও দ্বিধাগ্রস্ত পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে, অসম সাহসী করে তুলে, সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে ও প্রাণ উৎসর্গ করতে উজ্জীবিত করেছিল’।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘২৫ মার্চের গণহত্যা ছিলো একটি সুপরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে দমন করার চেষ্টা করা হয়’। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গবেষণায় উঠে এসেছে একাত্তরের ২৫ মার্চ তৎকালীন মেজর জিয়ার নেতৃত্বেই প্রথম বিদ্রোহ ঘোষিত হয়। তিনি সরাসরি পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন। জাতিকে প্রথম স্বাধীনতার স্বাদও জিয়াই দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী সেদিন বেতারে নিজের কানে শুনেছিলেন প্রয়াত প্রেসিডেন্টের সেই ঐতিহাসিক বিবৃতি। আজও ভুলতে পারেননি মেজর জিয়ার সেই ঐতিহাসিক ভাষণ। সেদিন বেতার ভাষণে জিয়া বলেছিলেন, ‘আমি মেজর জিয়া বলছি আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি’। তারপর শত শত বাঙালি মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে সামিল হন। পাকিস্তানি বর্বরতার বিরুদ্ধে তারাও অসীম সাহসের সঙ্গে লড়াই করেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হয়েছিল মানবতার বিরুদ্ধে বর্বরোচিত গণহত্যা। পোশাকি নাম ‘অপারেশন সার্চ লাইট’। রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি সেনার সাঁজোয়া বাহিনী ঢাকার বুকে চালায় নির্মম গণহত্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে গোটা ঢাকা শহর পরিণত হয় বধ্যভূমিতে। বাঙালি জাতিকেই মুছে ফেলার চেষ্টা হয়। পিলখানা, রাজারবাগ, নীলক্ষেত আক্রমণ করে পাকিস্তানি সেনারা। জগন্নাথ হলে চলে নৃশংসতম হত্যার সবচেয়ে বড় ঘটনা। পাকিস্তানি হায়েনাদের কাছ থেকে রক্ষা পায়নি রোকেয়া হলের ছাত্রীরাও। রোকেয়া হলেই  ৯ জন শিক্ষককে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানিদের অমানবিক হত্যাকাণ্ডের হাত থেকে শিশুরাও রক্ষা পায়নি। রাজাকার ও আল-বাদরদের সহায়তায় বাংলা মায়ের সুসন্তানদের বেছে বেছে হত্যা করা হয়। ২৫ মার্চ রাতে শুরু হয় হত্যাকাণ্ড। ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের আগে পর্যন্ত দেশজুড়ে চলে পাকিস্তানিদের বর্বরতা।

১৯৭১ সালের ১০ই ডিসেম্বর থেকে ১৪ই ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশের প্রায় সকল প্রথম শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা ও মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীকে ডেকে নিয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বাঙালি জাতিকে ধ্বংস করার। মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজার ‘এ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি’ নামক আত্মজীবনীতে উঠে এসেছে পাকিস্তানিদের সেই পরিকল্পনার কথা।  মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন ২৫ মার্চ রাত সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সেই রাতে ৭ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়, গ্রেফতার করা হয় আরো ৩ হাজার লোক। ঢাকায় ঘটনার শুরু হয়েছিল। এরপর সমস্ত পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে সৈন্যরা বাড়িয়ে চলে মৃতের সংখ্যা। জ্বলতে শুরু করে বাড়িঘর। লুঠপাঠ চলে অবাধে। সমস্ত বাংলাদেশ হয়ে ওঠে শকুন তাড়িত শ্মশান ভূমি।’

সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্কট সম্পর্কে যে শ্বেতপত্র পাকিস্তান সরকার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রকাশ করেছিল তাতে বলা হয় , ‘১৯৭১ সালের পয়লা মার্চ থেকে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত ১ লাখেরও বেশি মানুষের জীবননাশ হয়েছিল।’ গোটা পরিকল্পনার মূলে ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল এএকে নিয়াজী। মার্চের শুরুতেই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সকল পদক্ষেপ চূড়ান্ত করে যান। তিনি অবশ্য হত্যাকাণ্ড শুরুর আগেই ঢাকা থেকে ইসলামবাদে ফিরে যান। যাওয়ার আগে দিয়ে যান অসামরিক মানুষদের ওপর সামরিক অভিযানের নির্দেশ। বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল থেকেই প্রমাণিত পাকিস্তানি বর্বরতার ইতিহাস। পুরো অভিযানটাই হয় পাকিস্তান সরকার ও তাদের সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে। এমনকী, মেজর জেনারেল  খাদিম হোসেন রাজা-সহ বহু পাকিস্তানির লেখা আত্মজীবনী এবং বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনেও উঠে আসে সেই নৃশংসতা ও পরিকল্পনার কথা।

দেশীয় রাজাকারদের সহায়তায় ৩০ লক্ষ বাঙালিকে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদারেরা। তিন লক্ষ নারী হারান তাদের সম্ভ্রম। প্রতি বছরের মতো এবারও দিনটি পালিত হচ্ছে বাংলাদেশে। কিন্তু এবারই প্রথম ঘটা করে স্বাধীনতা দিবস পালন করছে  জামায়াতে ইসলাম। স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি বলে পরিচিত জামায়াত এবার একুশে ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসেও ভাষা শহীদদের প্রথমবারের মতো শ্রদ্ধা জানিয়েছে। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান নিজেই জানিয়েছেন, সংসদীয় রাজনীতির স্বার্থেই তিনি ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানান। কারণ তিনি এখন জাতীয় সংসদের বিরোধী দলনেতা। জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিশ্বাস করে না। মাতৃভাষার প্রতিও তাদের দায়বদ্ধতা নেই। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানকে সহায়তা করেছিল তারা। এখনও তাই ইসলামাবাদের সঙ্গে জামায়াতের বন্ধুত্ব রয়েছে।

অন্যদিকে, বিএনপি চিরকালই মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে কথা বলেছে। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন দলটির প্রথম সারির নেতারা। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার অভিশপ্ত ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের ভয়ঙ্কর স্মৃতিতে রাত ১০টা ৩০ থেকে এক মিনিটের ব্ল্যাকআউট কর্মসূচির কথা আগেই ঘোষণা করেছে সরকার। এছাড়াও ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে দেড়যুগ পর ফিরছে কুচকাওয়াজ। ভোর ৫টায় সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে সারা দেশের সমস্ত সরকরি ও বেসরকারি কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে।

জামায়াত সূত্রে জানানো হয়েছে, স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আলোচনা সভায় অংশ নেবেন জামায়াতের আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান-সহ অন্যান্যরা।  বৃহস্পতিবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও সংগঠনের সব পর্যায়ে আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠান পালন করা হবে। কিন্তু এখনও জামায়াতের তরফে একাত্তরে তাদের ভূমিকার জন্য ভুল স্বীকার করা হয়নি। জাতির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমাও চায়নি তারা। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এখনও অটুট। তাই জামায়াতের স্বাধীনতা দিবস পালনকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে কটাক্ষ বাড়ছে।
অন্যদিকে, বিএনপির তরফে দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ দেশজুড়ে স্বাধীনতা দিবস পালনের কথা ঘোষণা করেছেন। ২৫ মার্চ কালরাত্রির পাশাপাশি ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস পালনে গোটা দেশের বিএনপি কর্মকর্তারা প্রস্তুত। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) ভোর ৬টায় রাজধানীর নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশে বিএনপির কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেছেন, ‘মহান স্বাধীনতা দিবস বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে। অনেক প্রাণ ও রক্তপাতের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মেজর জিয়াউর রহমান দিশাহারা জাতিকে নতুন পথ দেখিয়েছিলেন।’

শুধু ঢাকা বা বাংলাদেশেই নয়, গোটা দুনিয়াতেই দিনটি যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পালিত হচ্ছে। বিদেশে অবস্থিত দূতাবাসগুলি স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজন করেছে বিশেষ অনুষ্ঠানের। সর্বত্রই ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা। সেইসঙ্গে ধিক্কার জানানো হচ্ছে একাত্তরে পাকিস্তানি সেনার বর্বরতারও।

novelonlite28
umchltd