ঢাকা শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ 

পরাশক্তি হিসেবে ভারতের উত্থান: মালয়েশিয়ার জন্য এর তাৎপর্য

ঢাকা এজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩:৫৫, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

শেয়ার

পরাশক্তি হিসেবে ভারতের উত্থান: মালয়েশিয়ার জন্য এর তাৎপর্য

ভারত দীর্ঘদিন ধরেই তার প্রকৃত শক্তি, প্রভাব ও আঞ্চলিক–বৈশ্বিক নেতৃত্বের সম্ভাবনার তুলনায় অবমূল্যায়িত হয়েছে। তবে বর্তমানে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে ভারতের উত্থান এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি নির্ণায়ক ভারসাম্যকারী শক্তি হিসেবে তার আবির্ভাব আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। একই সময়ে চীন অর্থনৈতিক মন্দা ও কৌশলগত চাপের মুখে পড়ায় এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি মালয়েশিয়া সফর কেবল কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং দুই দেশের জন্যই একটি কৌশলগত মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ভারতের অর্থনৈতিক উত্থান ও জনমিতিক শক্তি

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারত প্রায় ৬.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতি হিসেবে অবস্থান করছে। ভারতের নামমাত্র জিডিপি ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে এবং চলতি দশকের মধ্যেই জাপান ও জার্মানিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০৪০-এর দশকে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যেও দেশটি এগিয়ে চলেছে।

গত এক দশকে পণ্য ও পরিষেবা কর, একীভূত দেউলিয়া আইন, ডিজিটাল পাবলিক ফাইন্যান্স ব্যবস্থা এবং ব্যাপক অবকাঠামো বিনিয়োগের মতো কাঠামোগত সংস্কার ভারতের অর্থনীতিকে দৃঢ় ভিত্তি দিয়েছে।
বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল দেশ হিসেবে ভারতের মধ্যম বয়স ৩০ বছরের নিচে—যা তাকে দীর্ঘমেয়াদি জনমিতিক সুবিধা দিয়েছে। বিপরীতে, চীনে জনসংখ্যা দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগোচ্ছে এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমছে, যা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

‘অ্যাক্ট ইস্ট’ ও ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য সুযোগ

২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী মোদির ঘোষিত ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ ও ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগ উৎপাদন খাতকে সম্প্রসারিত করেছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বিকল্প সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তুলতে সহায়ক।
ডিজিটাল ইন্ডিয়া কর্মসূচির ফলে ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ডিজিটাল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। ফিনটেক, সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল বাণিজ্যে মালয়েশিয়া ও আসিয়ান দেশগুলোর জন্য নতুন অংশীদারিত্বের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন গতি

গত এক দশকে ভারত-মালয়েশিয়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১৯–২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। মালয়েশিয়া ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর, পাম অয়েল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানি করে, আর ভারত রপ্তানি করে ওষুধ, পরিশোধিত জ্বালানি, যন্ত্রপাতি ও আইটি সেবা।
ভারত মালয়েশিয়ার পাম অয়েলের অন্যতম বৃহৎ আমদানিকারক। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের সময় ভারত মালয়েশিয়াকে ২ লাখ মেট্রিক টন নন-বাসমতি চাল রপ্তানির বিশেষ অনুমতি দেয়—যা খাদ্য নিরাপত্তায় ভারতের নির্ভরযোগ্য অংশীদারিত্বের দৃষ্টান্ত।

জনসম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন

ভারত-মালয়েশিয়া সম্পর্ক কেবল অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষা, সংস্কৃতি ও পর্যটনেও গভীর সংযোগ রয়েছে। বহু মালয়েশীয় শিক্ষার্থী ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি শিক্ষা গ্রহণ করেন। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ খাতে ভারতের দ্রুত অগ্রগতি ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে জ্ঞান ও উদ্ভাবনভিত্তিক অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করবে।

একটি যৌথ ভবিষ্যৎ

ভারতের উত্থান এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মালয়েশিয়ার জন্য প্রশ্নটি ভারতকে বেছে নেওয়া না নেওয়ার নয়; বরং ভারতের উত্থানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়া। প্রধানমন্ত্রী মোদির সফর সেই প্রস্তুতিরই সূচনা—যেখানে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, জ্বালানি, খাদ্য নিরাপত্তা ও সংস্কৃতিতে বহুমাত্রিক অংশীদারিত্ব আগামী দশকে মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।

novelonlite28
umchltd