পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে গত ৩১ জানুয়ারি সাম্প্রতিক দশকের অন্যতম ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) “অপারেশন হেরফ ২.০” নামে ১২টি জেলায় সমন্বিত হামলা চালায়। কোয়েটা, গোয়াদার ও মাসতুংসহ বিভিন্ন এলাকায় বন্দুক হামলা, আত্মঘাতী বিস্ফোরণ এবং অস্থায়ীভাবে থানা ও সরকারি স্থাপনা দখলের ঘটনা ঘটে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, হামলায় ১৭ জন নিরাপত্তা সদস্য ও ৩১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। পাল্টা অভিযানে ১৪৫ জন বিদ্রোহী নিহত হয়েছে বলে দাবি করে। পাকিস্তানি বাহিনী, যদিও এই সংখ্যা নিয়ে বিএলএ আপত্তি জানায়। ঘটনার পর প্রদেশজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা অভিযান শুরু হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো স্থানীয় জনগণের প্রতি আচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বঞ্চনার অভিযোগ
বিশ্লেষকদের মতে, বেলুচিস্তানের সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এর শিকড় পাকিস্তানের স্বাধীনতার সময়কাল পর্যন্ত বিস্তৃত। আয়তনে পাকিস্তানের ৪৪ শতাংশ হলেও জনসংখ্যা মাত্র ৬ শতাংশ। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ—বিশেষত সুই গ্যাসক্ষেত্র, তামা, স্বর্ণ ও কয়লা—হলেও প্রদেশটি দেশের দরিদ্রতম অঞ্চলগুলোর একটি। প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে বাস করে এবং বেকারত্বের হার প্রায় ৩৩ শতাংশ।
সমালোচকদের দাবি, বিপুল গ্যাস সরবরাহ সত্ত্বেও প্রদেশটি গ্যাস আয়ের মাত্র ১২.৫ শতাংশ পায় এবং জাতীয় অর্থ কমিশন থেকে পায় ৯.৭ শতাংশ বরাদ্দ। এই বণ্টনকে অনেকেই বৈষম্যমূলক বলে মনে করেন।
সিপিইসি ও গোয়াদার ইস্যু
৬২ বিলিয়ন ডলারের চায়না-পাকিস্তান ইকনোমিক করিডর (সিপিইসি) প্রকল্প, বিশেষ করে গোয়াদার বন্দর উন্নয়ন, নতুন করে উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় জনগণের অভিযোগ, ভূমি অধিগ্রহণ, কর্মসংস্থানে বঞ্চনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগ না পাওয়ায় তারা প্রান্তিক হয়ে পড়ছেন।
মানবাধিকার উদ্বেগ
বেলুচিস্তানে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ২০২৫ সালে হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল অব বেলুচিস্তান ১,৪৫৫টি ঘটনার তথ্য প্রকাশ করে। এর মধ্যে ১,০৫২ জন বছরের শেষে নিখোঁজ ছিলেন, ৩১৭ জন মুক্তি পান এবং ৮৩ জনের হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একাধিক নারীও গুমের শিকার হয়েছেন। এছাড়া ১৪ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে নিহত হওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে।
নতুন আইন ও বিতর্ক
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রাদেশিক সরকার “বেলুচিস্তান প্রিভেনশন, ডিটেনশন অ্যান্ড ডির্যাডিক্যালাইজেশন রুলস ২০২৫” অনুমোদন করে, যার আওতায় বিচারিক তদারকি ছাড়া আটক কেন্দ্র পরিচালনার বিধান রাখা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এ আইনকে গুমকে বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেছে।
নারী আত্মঘাতী হামলাকারীর আবির্ভাব
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারী আত্মঘাতী হামলাকারীর অংশগ্রহণ পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ২০২২ সালে প্রথম নারী হামলাকারী হিসেবে শারি বেলুচের নাম সামনে আসে। এরপর আরও কয়েকজন শিক্ষিত তরুণীর অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি সমাজে গভীর হতাশা ও বিচ্ছিন্নতার প্রতিফলন।
রাজনৈতিক সমাধানের প্রশ্ন
নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংলাপের অভাবকে অনেক পর্যবেক্ষক সংকটের মূল কারণ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, সামরিক সমাধান দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে পারবে না। বরং ন্যায্য সম্পদ বণ্টন, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করাই টেকসই সমাধানের পথ হতে পারে।
বেলুচিস্তানের সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী ঘটনা পাকিস্তানের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরেছে—শুধু নিরাপত্তা কৌশল নয়, নাকি রাজনৈতিক উদ্যোগ ও আস্থার পুনর্গঠনের মাধ্যমে প্রদেশটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হবে?
আরও পড়ুন:









