একটি তিব্বতি প্রবাদ আছে—“অসৎ উদ্দেশ্যের কাজ শেষ পর্যন্ত নিজেরই ক্ষতি ডেকে আনে।” সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের প্রতি চীনের কঠোর অবস্থান বিশ্লেষণ করলে এই প্রবাদটি প্রাসঙ্গিক মনে হয়। ২০২৫ সালের শরৎ থেকে বেইজিং-টোকিও সম্পর্ক এক নতুন মোড় নিয়েছে। নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন রূপ নিয়েছে ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টির কৌশলে।
সেনকাকু ঘিরে উত্তেজনা বৃদ্ধি
পূর্ব চীন সাগরের বিতর্কিত সেনকাকু দ্বীপ (চীনের ভাষায় দিয়াওইউ) ঘিরে চীনা কোস্ট গার্ড জাহাজের উপস্থিতি গত এক বছরে নজিরবিহীন মাত্রায় পৌঁছেছে। জাপানের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় ৩৫৬ দিন চীনা জাহাজ দ্বীপপুঞ্জের সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করেছে। একাধিকবার জাপানের আঞ্চলিক জলসীমায় অনুপ্রবেশের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বেইজিংয়ের বক্তব্য আরও কঠোর হয়েছে। জাপানের প্রতিরক্ষা সংস্কারকে তারা “পুনরায় সামরিকীকরণ” হিসেবে চিত্রিত করছে। সংকট ব্যবস্থাপনার কূটনৈতিক প্রক্রিয়াও কার্যত স্থবির।
অর্থনৈতিক চাপ ও সম্পর্কের ভাঙন
১৯৯০-এর দশক ও ২০০০-এর দশকের শুরুতে চীন-জাপান সম্পর্ক ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও কার্যকর। ১৯৯৫ সালে যেখানে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ছিল প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার, ২০২১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা সম্পর্ককে ভারসাম্যে রেখেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চীন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও চীনে কার্যরত জাপানি কোম্পানির ওপর অনানুষ্ঠানিক চাপ প্রয়োগের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি আর বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নয়; বরং এটি “স্বাভাবিকীকৃত চাপের কৌশল”।
আঞ্চলিক সমীকরণে পরিবর্তন
চীনের এই নীতি কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে সমগ্র পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জাপানের ত্রিপাক্ষিক নিরাপত্তা সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার হয়েছে। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও ফিলিপাইনের সঙ্গে পারস্পরিক প্রবেশাধিকারের চুক্তি করেছে টোকিও। এ ছাড়া ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গেও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়িয়েছে জাপান। এসব পদক্ষেপকে বেইজিং প্রায়ই “নিয়ন্ত্রণ কৌশল” হিসেবে দেখালেও আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এগুলো মূলত চীনের আচরণের প্রতিক্রিয়া।
আসিয়ান দেশগুলোর পুনর্মূল্যায়ন
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোও পরিস্থিতি নতুনভাবে বিবেচনা করছে। তারা মনে করছে, কেবল কূটনীতির মাধ্যমে বিরোধ স্থিতিশীল করা কঠিন হয়ে উঠছে। ফলে তারা বিকল্প নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের পথ খুঁজছে। এর ফলে আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খলে চীনের কেন্দ্রীয়তা কিছুটা ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
কৌশলগত ভুলপাঠ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা কেবল শক্তি প্রদর্শনের ওপর নির্ভর করে না; বরং বৈধতা, আস্থা ও বহুমাত্রিক সহাবস্থানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। জাপানকে একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে চাপ প্রয়োগের নীতি চীনের কৌশলগত বিকল্প সংকুচিত করছে। চীন যদি বর্তমান পথেই অগ্রসর হয়, তবে ভবিষ্যতে এমন এক আঞ্চলিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারে যেখানে দেশগুলো চীনের শক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং তার আচরণের বিরুদ্ধে একত্রিত হবে।
একটি পুনর্বিবেচিত নীতি—যেখানে থাকবে সংযম, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং প্রতিযোগিতামূলক সহাবস্থান—হয়তো উত্তেজনা কমাতে সহায়ক হতে পারে। অন্যথায়, কঠোর অবস্থান শেষ পর্যন্ত বেইজিংয়ের নিজের কৌশলগত স্বার্থকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
আরও পড়ুন:









