ঢাকা রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬ 

অবকাঠামো উন্নয়নের নামে বাংলাদেশে আধিপত্য বিস্তারে সচেষ্ট চীন

ঢাকা এজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১:২০, ২৩ আগস্ট ২০২৬

শেয়ার

অবকাঠামো উন্নয়নের নামে বাংলাদেশে আধিপত্য বিস্তারে সচেষ্ট চীন

সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হতেই পারে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে চীন। সম্প্রতি চীনের ১২টি কোম্পানি বাংলাদেশে প্রায় ৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। চীনা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের লজিস্টিকস, জ্বালানি, নবায়নযোগ্য শক্তি, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কথা বলছে। তবে চীনাদের সবচেয়ে বেশি উৎসাহ পায়রা বন্দর ও মংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নে। সেইসঙ্গে প্রস্তাবিত চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশে অর্থনৈতিক করিডোরে। কারণ তারা চাইছে বঙ্গোপসাগরে নিজেদের আধিপত্য বাড়াতে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে সঙ্গে নিয়ে তারা ভূরাজনীতিতে নিজেদের ক্ষমতা বাড়াতে মরিয়া। এক্ষেত্রে অবকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে তাদের বড় হাতিয়ার। 

তাই চীনা বিনিয়োগের বেশিরভাগটাই ব্যায় হয় অবকাঠামোর উন্নয়নে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে  প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর তাই উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর জোর দিয়েছেন । তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ শুধু বিনিয়োগ নয়, উৎপাদন বাড়ায় এমন বিনিয়োগ চায়। বাংলাদেশের লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়া। কিন্তু এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে গেলে শুধু অবকাঠামো বানালেই চলবে না, প্রয়োজন প্রকৃত উৎপানমুখী বিনিয়োগ। ঋণের বোঝায় আটকে গেলে দেশের অর্থনীতি আরও বিপাকে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তাদের উদাহরণ, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান। 

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।  কিন্তু সেই দেশে বাংলাদেশের রপ্তানি বহর এখনও ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়নি। ট্রেড ব্যালান্সে বিপুল ঘাটতি আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ভান্ডারে চাপ বাড়িয়ে চলেছে। উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বাড়লেই একমাত্র এই ঘাটতি কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু তারা উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে উৎসাহী নয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ সাল থেকে বাংলাদেশকে চীন ঋণ ও অনুদান হিসাবে ১ হাজার ১০৪ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু ২০২১ সাল পর্যন্ত মিলেছে মাত্র ৭৭২ কোটি ডলার। এর বেশিরভাগটাই মিলেছে ২০১৬ সালে শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের পর। তার সেই সফরে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার ব্যায়ে ২৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল। বাস্তবে এখন পর্যন্ত অল্প কয়েকটি প্রকল্পেই ঋণচুক্তি হয়েছে।  সরকারি তথ্য বলছে, বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের ১০ শতাংশেরও কম এসেছে চীন থেকে। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা  চীনা ঋণ নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন। 

কমিউনিস্টশাসিত দেশটি বাংলাদেশে অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে ভূরাজনীতিতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে চায় বলে কূটনৈতিকমহল মনে করে।  বাংলাদেশের প্রতি চীনের আগ্রহ বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত অবস্থান; বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সামুদ্রিক যোগাযোগ; বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রভৃতি। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে প্রতিবেশী দেশকে কাছে টেনে বঙ্গোপসাগরে নিজেদের সামরিক শক্তিবৃদ্ধি। সমুদ্রে নিজেদের শক্তি বাড়াতে মরিয়া চীন এভাবেই পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকেও নিজেদের কব্জায় নিয়ে আসে। 

ইতিমধ্যেই পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কিংবা বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো প্রভৃতি মেগা প্রকল্পে চীন থেকে শত শত কোটি ডলারের ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, মেগা প্রকল্পগুলোর অনিয়ন্ত্রিত ঋণ পরিশোধের চাপ ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিকে বিপাকে ফেলবে। এছাড়া কয়লাভিত্তিক প্রকল্পগুলোর পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করে দ্রুত নবায়নযোগ্য শক্তি ও সবুজ প্রযুক্তিতে স্থানান্তরিত করার কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞরা। 

চীনা বিনিয়োগ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেছেন,  ‘অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ বা ঋণ আসাটাই কেবল শেষ কথা নয়, এর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত তা থেকে সর্বোচ্চ সুফল আদায় করা। সরকার যদি বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনার মাধ্যমে সবচেয়ে কম সুদে এবং দেশের জন্য সুবিধাজনক শর্তে ঋণ ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারে, তবে এই অংশীদারিত্বগুলো আমাদের টেকসই প্রবৃদ্ধি ও কাঙ্ক্ষিত জাতীয় সাফল্য অর্জনে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।’  জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম জ্বালানি খাতে চীন বিনিয়োগের বিষয়ে বলেছেন, ‘প্রতিযোগিতাহীন চুক্তি ও চড়া সুদের ঋণের কারণে জ্বালানি খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় বেড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ সরকারের আয়ের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ ঘাটতি তৈরি করায় সরকার রানিং বিল ও ঋণের কিস্তি মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। ক্ষতিকর এসব চুক্তি এখনই পুনর্মূল্যায়ন না করলে দেশ চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়বে।’ 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চলতি বছরের ২৩ থেকে ২৬ জুন চীনে নিজের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে চীনের ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভে (জিডিআই) নিয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে কথা হয় তার। চীনের নতুন প্রস্তাব চায়না-মায়ানমার-বাংলাদেশ-ইকোনমিক করিডর (সিএমবিইসি)। চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হবে প্রস্তাবিত এই করিডোর। সেটি যাবে মিয়ানমারের মান্দালয়ে। সেখান থেকে করিডোরের একটি অংশ মিয়ানমারের ইয়াঙ্গন এবং অন্য অংশ বিস্তৃত হবে রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত। প্রস্তাব অনুযায়ী মিয়ানমারের রাখাইন থেকে সংযোগটি সড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হবে। বাংলাদেশ সরকার এখনও এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। তবে বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে। এই সিএমবিইসি যে আসলে বঙ্গোপসাগরে চীনাদের সামরিক আধিপত্য বিস্তারের একটি কৌশল, মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞরা। চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' বা বিআরআইয়ের মতো এটাও একটি কৌশল। এই কৌশলেও তারা অংশীদার করতে চাইছে বাংলাদেশকে।

এমনিতেই মিয়ানমারে নির্যাতনের কারণে সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছে বেশ কয়েক বছর ধরে। প্রস্তাবিত যোগাযোগ ব্যবস্থা রোহিঙ্গা সমস্যা আরও বাড়াবে। সেইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি সাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির শর্তগুলো লঙ্ঘিত হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। চীনের স্বার্থসিদ্ধি করতে গিয়ে নিজেদের দেশকে বিপাকে ফেলার ঝুঁকিও রয়েছে। সিএমবিইসিতে যোগদানে রাজি করাতে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন স্বাভাবিক কারণেই সচেষ্ট। বাংলাদেশ সরকার প্রস্তাব মেনে নিলে মোংলা বন্দর, চট্টগ্রাম বন্দর, বে টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চীনের সামরিক সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের সামরিক শক্তিবৃদ্ধির দুয়ারও খুলে যাবে। সমুদ্রে বেড়ে যাবে বেজিংয়ের আধিপত্য।  বাংলাদেশের জলস্থল ব্যবহার করতে দিয়ে চীনা আগ্রাসনে মদদ যোগানো কতোটা যুক্তিসঙ্গত? কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

novelonlite28
umchltd