জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির ১ থেকে ৩ জুলাই ভারত সফর দুই দেশের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা ও ভবিষ্যৎ কৌশলগত সম্ভাবনার নতুন বার্তা দিয়েছে। তিন দিনের এই সফরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকাইচিকে ‘ছোট বোন’ হিসেবে অভিহিত করেন।
১৬তম বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে দুই দেশ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, জ্বালানি স্থিতিশীলতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ একাধিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ঘোষণা করে। জাপানের অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিও প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে যৌথ অর্থনৈতিক ফোরামে অংশ নেন।
তবে শীর্ষ সম্মেলনের পর নয়াদিল্লির বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী আলোচনায় ভিন্ন একটি ব্যাখ্যাও সামনে এসেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, জাপান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমানোর পথ খুঁজছে। জাপানের যুক্তরাষ্ট্রে ৫৫০ বিলিয়ন ডলার এবং ভারতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ৬২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির তুলনাও এ ধারণাকে জোরদার করছে।
কিন্তু এমন তুলনা জাপানের কৌশলগত হিসাবকে অতিরঞ্জিতভাবে সরল করে ফেলে। ভারত-জাপান সম্পর্ককে যুক্তরাষ্ট্র-জাপান জোটের সঙ্গে তুলনা করে বিচার করা যেমন ভুল, তেমনি ভারতের সঙ্গে জাপানের ক্রমবর্ধমান সহযোগিতাকে যুক্তরাষ্ট্র-জাপান সম্পর্ক দুর্বল হওয়ার লক্ষণ হিসেবে দেখাও বাস্তবসম্মত নয়।
জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ভিত্তি বহু দশকের নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। ১৯৬০ সাল থেকে কার্যকর থাকা পারস্পরিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা চুক্তি অনুযায়ী, জাপানের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জাপানে প্রায় ৬০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে—যা বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক সক্ষমতাসহ বিস্তৃত প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি জাপানের নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
চীনকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগও দুই দেশের জোটকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। চীনের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জাপানের নিয়ন্ত্রিত সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জের আশপাশে বেইজিংয়ের সামরিক তৎপরতা টোকিওর জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে জাপান প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে জাপানের আত্মরক্ষা বাহিনীর সমন্বয়ও জোরদার করছে। ফলে ভারতের সঙ্গে যতই ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে উঠুক, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক নিরাপত্তা জোটের বিকল্প হিসেবে ভারতকে দেখার সম্ভাবনা খুবই কম।
ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তা অবশ্যই জাপানের জন্য জটিলতা তৈরি করেছে। তবে তা জাপান-যুক্তরাষ্ট্র জোটের মৌলিক ভিত্তিকে বদলে দেয়নি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সময় থেকেই টোকিওর কৌশল ছিল—যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু দুই দেশের নিরাপত্তা জোটের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বহাল থাকে। তাকাইচিও সেই ধারাই অনুসরণ করছেন। ১৯৭১ সালের ‘নিক্সন শক’ কিংবা ১৯৮০-এর দশকের বাণিজ্যিক বিরোধের মতো অতীতের সংকটও জোটকে ভেঙে দিতে পারেনি।
তাহলে ভারতের জন্য তাকাইচির সাম্প্রতিক সফরের তাৎপর্য কী?
দুই দেশের সরকার যে ভাষায় সম্পর্ককে তুলে ধরেছে, তার মধ্যেই উত্তরটি রয়েছে—এটি একটি ‘কৌশলগত অভিন্নতার অংশীদারত্ব’ অর্থাৎ ভারত-জাপান সম্পর্ককে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই দেশের পৃথক সম্পর্কের তুলনায় না দেখে নিজেদের স্বার্থ ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা জরুরি।
দুই দেশই বর্তমানে অস্ত্রায়িত সরবরাহব্যবস্থা, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও ওষুধের কাঁচামালের ক্ষেত্রে চীনের ওপর নির্ভরতার মতো অভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সাম্প্রতিক শীর্ষ সম্মেলনে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, জ্বালানি স্থিতিশীলতা এবং প্রযুক্তিকে সহযোগিতার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ। সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মোদি জানান, গত এক বছরে প্রায় ১২৯টি বেসরকারি খাতের চুক্তি হয়েছে, যার মাধ্যমে দুই ট্রিলিয়ন ইয়েনের বেশি জাপানি বিনিয়োগের পথ তৈরি হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির যৌথ উন্নয়ন এবং সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা—সবকিছুই দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের গভীর সংযোগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর এই জোরকে দুর্বলতা নয়, বরং ভারত-জাপান অংশীদারত্বের অন্যতম শক্তি হিসেবে দেখা উচিত। যুক্তরাষ্ট্র-জাপান জোট মূলত একটি অভিন্ন সামরিক হুমকি মোকাবিলার জন্য গড়ে উঠেছে। বিপরীতে ভারত-জাপান সহযোগিতার মূল লক্ষ্য হচ্ছে অভিন্ন অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমানো এবং সরবরাহব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ ও স্থিতিশীল করা। ফলে একটি সামরিক জোটের মানদণ্ড দিয়ে ব্যবসা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাভিত্তিক অংশীদারত্বকে বিচার করলে তা স্বাভাবিকভাবেই তুলনামূলকভাবে দুর্বল মনে হবে।
নিজস্ব বাস্তবতার আলোকে দেখলে অবশ্য ভারত-জাপান সম্পর্কের সম্ভাবনা অনেক বেশি। জাপানের ভারতের দিকে অগ্রসর হওয়াকে তাই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিকল্প পথ তৈরির প্রস্তুতি হিসেবে নয়, বরং বিদ্যমান জোট কাঠামোর মধ্যেই কৌশলগত বৈচিত্র্য তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
তবে সামনে বড় প্রশ্ন হলো—এই বাণিজ্যিক ও কৌশলগত গভীরতা কি দুই দেশের জনগণের মধ্যেও একই ধরনের সম্পর্ক তৈরি করতে পারবে?
বর্তমানে ভারত-জাপান সম্পর্কের বড় অংশই পরিচালিত হয় সরকারি মন্ত্রণালয়, শীর্ষ সম্মেলন, কূটনৈতিক ঘোষণা ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের মাধ্যমে। দীর্ঘমেয়াদে এই সম্পর্কের সাফল্য নির্ভর করবে দুই দেশের সমাজ পরস্পরকে কতটা কাছ থেকে জানতে পারছে তার ওপর। শিক্ষার্থী, পর্যটক ও সাধারণ মানুষের পারস্পরিক যাতায়াত তাই সম্পর্কের ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠতে পারে।
দুই দেশের নেতারা ২০২৭ সালকে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৭৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে ‘শেয়ার্ড হরাইজনস’ বা ‘অভিন্ন দিগন্তের বছর’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেই বছরটি কেবল আনুষ্ঠানিক উদ্যাপনে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ভারত ও জাপানের জনগণের মধ্যে বাস্তব ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের নতুন ভিত্তি তৈরি করবে—সেটিই শেষ পর্যন্ত এই অংশীদারত্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ভারতের সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক তাই কোনো ‘প্ল্যান বি’ নয়; বরং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতার মধ্যে গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র ও সম্ভাবনাময় অংশীদারত্ব।
আরও পড়ুন:









