ঢাকা শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬ 

চীনের সঙ্গে নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশ:কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার আহ্বান

ঢাকা এজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১:৪৩, ২৪ জুলাই ২০২৬

শেয়ার

চীনের সঙ্গে নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশ:কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার আহ্বান

বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বেইজিং সফরে অবকাঠামো, বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করলেও জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা সমানভাবে জরুরি।

সফরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অর্জন ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি)-এর মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের দলীয় পর্যায়ের যোগাযোগ কেবল রাষ্ট্র-রাষ্ট্র সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাজনৈতিক, সামাজিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারে।

শিক্ষা ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং নতুন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চীনা ভাষা শিক্ষা, বৃত্তি ও একাডেমিক বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হলেও বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে স্বচ্ছতা ও প্রভাব বিস্তার সম্পর্কিত আলোচনা রয়েছে।

গণমাধ্যম খাতেও চীনের উপস্থিতি ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি) বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সঙ্গে কনটেন্ট বিনিময়, সাংবাদিক প্রশিক্ষণ এবং সম্প্রচার সহযোগিতা বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সহযোগিতার অংশ হিসেবে এসব উদ্যোগকে দেখা হলেও বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে চীন আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে।

অবকাঠামো উন্নয়নেও চীনের বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ, সেখানে প্রস্তাবিত চীনা শিল্পপার্ক এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং সংযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় অপরিহার্য।

অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ভারসাম্যের বিষয়টি সামনে এসেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বছরে ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি হলেও বাংলাদেশের রপ্তানি তার তুলনায় অনেক কম। ফলে ভবিষ্যৎ আলোচনায় বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীনা বাজারে অধিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং বহুমুখী অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব অপরিহার্য, যেখানে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। তবে এ ধরনের সম্পর্ককে টেকসই ও লাভজনক করতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল অনুসরণ করতে হবে।

চীনের সঙ্গে সহযোগিতা আরও গভীর হওয়ার প্রেক্ষাপটে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, নীতিগত স্বাধীনতা এবং কৌশলগত ভারসাম্য কতটা দৃঢ়তার সঙ্গে বজায় রাখতে সক্ষম হবে।

novelonlite28
umchltd