ঢাকা শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬ 

পাকিস্তানের পানি সংকট: ঘাটতির চেয়ে লুট ও অব্যবস্থাপনাই বড় কারণ

ঢাকা এজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০০:৪৩, ২৯ আগস্ট ২০২৬

শেয়ার

পাকিস্তানের পানি সংকট: ঘাটতির চেয়ে লুট ও অব্যবস্থাপনাই বড় কারণ

জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও হিমবাহ সংকোচন—পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান পানি সংকটের কারণ হিসেবে সাধারণত এসব বিষয়কেই দায়ী করা হয়। তবে এসব বাস্তব কারণের পাশাপাশি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা এবং পানিসম্পদের ক্রমবর্ধমান বেসরকারিকরণও দেশটির পানি সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

পাকিস্তান বর্তমানে একটি গুরুতর পরিবেশগত ঝুঁকির দিকে এগোচ্ছে। ১৯৫০-এর দশকের শুরুতে দেশটিতে মাথাপিছু বার্ষিক পানির প্রাপ্যতা ছিল ৫ হাজার ঘনমিটারেরও বেশি। বর্তমানে তা কমে ৯০০ ঘনমিটারের নিচে নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পানি সংকটের সীমার অনেক নিচে অবস্থান করছে দেশটি।

দেশটির পানির চাহিদা মেটাতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা ব্যাপক। বর্তমানে গৃহস্থালি ব্যবহারের প্রায় ৭০ শতাংশ, গ্রামীণ পরিবারের প্রায় ৯০ শতাংশ এবং কৃষি সেচের অর্ধেকেরও বেশি ভূগর্ভস্থ পানি থেকে আসে। কিন্তু প্রকৃতি যে হারে এই পানির মজুত পুনর্ভরণ করতে পারে, তার চেয়ে দ্রুত তা উত্তোলন করা হচ্ছে।

পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো—লাখ লাখ পাকিস্তানি কলের পানি নিরাপদ কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন; অথচ একই সময়ে বেসরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সেই ভূগর্ভস্থ পানিই বোতলজাত করে বাজারে বিক্রি করে বিপুল ব্যবসা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানে বোতলজাত পানির বাজারের বিস্তার মূলত ভোক্তাদের প্যাকেটজাত পানি পছন্দের কারণে হয়নি। বরং নিরাপদ পানি সরবরাহে সরকারি ব্যবস্থার ব্যর্থতা এই বাজারের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে। জনসাধারণের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার পর বেসরকারি কোম্পানিগুলো সেই শূন্যস্থান পূরণ করে। ফলে নাগরিকদের মৌলিক প্রয়োজনীয় একটি সম্পদ ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক আমল থেকে চলে আসা ভূমি ও ভূগর্ভস্থ পানির আইনি কাঠামোও বড় ভূমিকা রাখছে। অনেক ক্ষেত্রে জমির মালিকরা তাদের জমির নিচের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর ব্যাপক অধিকার ভোগ করেন। ফলে উৎপাদনশীল জলাধারের ওপর জমি কিনে কোম্পানিগুলো তুলনামূলক কম খরচে বিপুল পরিমাণ পানি উত্তোলন করতে পারে। পরে পরিশোধিত সেই পানি বাজারে বিক্রি করা হয় বহুগুণ বেশি দামে।

পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন নিরীক্ষায় দেখা গেছে, কয়েক বছরে বড় বড় বোতলজাত পানি কোম্পানি বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করেছে। উত্তোলিত পানির উল্লেখযোগ্য অংশ প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় অপচয়ও হয়েছে। এসব উত্তোলন কেন্দ্রের আশপাশের অনেক বাসিন্দা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া, কূপ শুকিয়ে যাওয়া এবং অনিরাপদ পানির উৎসের ওপর নির্ভরতা বাড়ার অভিযোগ করেছেন।

শেখুপুরার কাছে ভাটি দিলওয়ানের মতো গ্রামগুলোতে স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, তাদের এলাকার ভূগর্ভস্থ পানি বোতলজাত হয়ে শহরের বাজারে চলে যাচ্ছে, অথচ স্থানীয় মানুষ নিজেরাই নিরাপদ পানির সংকটে ভুগছেন।

পাকিস্তানের এ পরিস্থিতি অবশ্য একেবারে অনন্য নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বোতলজাত পানি উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে জনসাধারণের পানিসম্পদ বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। তবে পাকিস্তানে সমস্যা আরও গুরুতর, কারণ নিরাপদ পানির সরকারি বিকল্প এখনো অত্যন্ত দুর্বল। ফলে বোতলজাত পানির বাজারকে কেবল ভোক্তার পছন্দ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর পেছনে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতাও স্পষ্ট।

পানি সংকটের প্রভাব শুধু মানুষের দৈনন্দিন পানির চাহিদায় সীমাবদ্ধ নেই। দূষিত পানি থেকে সৃষ্ট বিভিন্ন রোগ পাকিস্তানের বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। দূষিত ভূগর্ভস্থ পানি শিশুদের অপুষ্টি, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং স্বাস্থ্য ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গেও যুক্ত। অর্থাৎ পাকিস্তানের সমস্যা শুধু পানির স্বল্পতা নয়; এটি ক্রমে একটি বড় জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হচ্ছে।

২০১৮ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট বোতলজাত পানি উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর ওপর ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের জন্য ফি আরোপ এবং শিল্প খাতে পানি উত্তোলনের ওপর কঠোর নজরদারির নির্দেশ দেয়। এই পদক্ষেপ ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা সামনে আনলেও এর মাধ্যমে পাকিস্তানের পানি ব্যবস্থাপনার সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিভিন্ন প্রদেশে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভিন্নতা দেখা যায়।

সম্প্রতি পাঞ্জাব ভূগর্ভস্থ পানিকে জনসাধারণের সম্পদ হিসেবে ঘোষণা এবং বেসরকারি পানি উত্তোলনের জন্য লাইসেন্স ব্যবস্থা জোরদার করতে আইন প্রণয়ন করেছে। এসব পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও কয়েক দশকের অব্যবস্থাপনা থেকে তৈরি সংকট শুধু আইন করে সমাধান করা কঠিন। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা সীমিত, আইন প্রয়োগে রয়েছে অসঙ্গতি এবং বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর প্রভাবও নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখছে।

এর পাশাপাশি ইন্দুস অববাহিকাকে ঘিরে আরও বড় ধরনের বিরোধ তৈরি হচ্ছে। বিতর্কিত খাল প্রকল্প, করপোরেট কৃষির সম্প্রসারণ এবং পানি বণ্টন নিয়ে প্রদেশগুলোর পরস্পরবিরোধী দাবি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন এসব চাপকে আরও তীব্র করছে ঠিকই, তবে বর্তমান সংকটের জন্য শুধু জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করা যায় না। পানি নিরাপত্তা এখন পাকিস্তানে সুশাসন, কেন্দ্র-প্রদেশ সম্পর্ক এবং সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানকে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানিকে জমির মালিকানার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে না দেখে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি যৌথ জনসম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বড় বাণিজ্যিক পানি উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য স্বচ্ছ লাইসেন্স ব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে উত্তোলনের সীমা নির্ধারণ এবং রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ চালু করা জরুরি।

একই সঙ্গে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, বিকেন্দ্রীভূত পানি পরিশোধন ব্যবস্থা, বর্জ্য পানি পুনর্ব্যবহার এবং ভূগর্ভস্থ জলাধার পুনর্ভরণের মতো স্থানীয় উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ব্যবস্থা বড় অবকাঠামো প্রকল্পের তুলনায় কম ব্যয়বহুল, পরিবেশবান্ধব ও অধিকতর ন্যায়সংগত হতে পারে।

পাকিস্তান সাধারণত জাতীয় নিরাপত্তাকে সীমান্ত, অস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখে। কিন্তু দেশের ভূগর্ভস্থ পানির মজুত যদি ক্রমাগত নিঃশেষ হতে থাকে এবং নাগরিকদের নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।

তাই পাকিস্তানের ভবিষ্যতের পানি সংকট কেবল নদী বা জলাধার নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্ন হলো—পানি কি সবার জন্য একটি যৌথ জনসম্পদ হিসেবে থাকবে, নাকি অর্থ ও ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা আরেকটি বাণিজ্যিক সম্পদে পরিণত হবে। সময়মতো এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর না দেওয়া হলে ভবিষ্যতে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সংঘাত হয়তো ভূখণ্ড নিয়ে নয়, বরং অবশিষ্ট প্রতিটি ফোঁটা পানি নিয়ে হতে পারে।

novelonlite28
umchltd