ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬ 

আফগানিস্তানের ‘ছায়া রাষ্ট্র’ কাবুলে জন্ম নেয়নি

ঢাকা এজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩:৫২, ২৬ আগস্ট ২০২৬

শেয়ার

আফগানিস্তানের ‘ছায়া রাষ্ট্র’ কাবুলে জন্ম নেয়নি

আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থান দেশটির অভ্যন্তরীণ ইতিহাসের কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এর পেছনে ছিল আঞ্চলিক পৃষ্ঠপোষকতা, গোয়েন্দা হিসাব-নিকাশ এবং আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘ লড়াই। তালেবানের উৎপত্তি বুঝতে হলে শুধু কাবুলের রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে তাকালে হবে না; এর শিকড় খুঁজতে হবে আফগানিস্তানের বাইরে গড়ে ওঠা একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে।

২০২১ সালের আগস্টে তালেবান দ্বিতীয়বারের মতো আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করে। কিন্তু এই প্রত্যাবর্তন হঠাৎ করে ঘটেনি। এর ইতিহাস কয়েক দশক আগের। সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের পর দেশটি পুনর্গঠনের পথে না গিয়ে পরিণত হয় প্রক্সি যুদ্ধ, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং গোয়েন্দা তৎপরতার কেন্দ্রে। তালেবান সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে কেবল স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে আসেনি; বরং সেই পরিস্থিতির মধ্যেই একটি শক্তি হিসেবে গড়ে উঠেছিল।

বর্তমান তালেবান সরকারের প্রধান হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার নেতৃত্বাধীন শাসনব্যবস্থাকে বোঝার জন্য সংগঠনটির প্রাথমিক গঠন ও বিকাশের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। তালেবানের মতাদর্শ, নেতৃত্ব কাঠামো ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এমন এক পরিবেশে গড়ে ওঠে, যেখানে আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব বারবার বহিরাগত শক্তির কৌশলগত স্বার্থের কাছে চাপা পড়ে। বিশেষ করে পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বিভিন্ন ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সহায়তা এবং পরবর্তী সময়ে তালেবানকে সমর্থনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও আফগানিস্তানে শান্তি আসেনি। একসময় সোভিয়েতবিরোধী প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত মুজাহিদিন গোষ্ঠীগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ড. নাজিবুল্লাহ সরকারের পতনের পর কাবুলের ক্ষমতা দখল নিয়ে শুরু হয় ভয়াবহ সংঘাত। পাকিস্তানের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কাঠামোও যুদ্ধ-পরবর্তী আফগানিস্তানের রাজনৈতিক বিন্যাসকে নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।

১৯৯২ সালের এপ্রিলের পেশোয়ার চুক্তির মাধ্যমে নাজিবুল্লাহ সরকারের পতনের পর একটি রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়াও আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বহিরাগত হস্তক্ষেপের অভিযোগ থেকে মুক্ত ছিল না। ফলে কাবুলে একটি স্থিতিশীল ও সার্বভৌম রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার পরিবর্তে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আরও গভীর হয়।

তালেবানের উত্থানকে বোঝার ক্ষেত্রে এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সংগঠনটি কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগান সমাজের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া ছিল না। মুজাহিদিন নেতাদের অনেকেই যখন নিজেদের স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছিলেন এবং বিভিন্ন বিদেশি শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলছিলেন, তখন পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের কাছে একটি নতুন, তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত ও সংগঠিত শক্তির প্রয়োজন দেখা দেয় বলে বিশ্লেষণে বলা হয়।

হিজব-ই-ইসলামি, জামিয়াত-ই-ইসলামি, ন্যাশনাল স্যালভেশন ফ্রন্টসহ বিভিন্ন মুজাহিদিন গোষ্ঠীর সংঘর্ষে আফগানিস্তান আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। একই সময়ে পাকিস্তান-চীন কৌশলগত সম্পর্ক গভীর হচ্ছিল এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা শক্তিগুলোও আফগানিস্তান ও দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে আগ্রহী ছিল। ফলে আফগানিস্তান নিজস্ব ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বদলে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতার ময়দানে পরিণত হয়।

এই প্রেক্ষাপটেই দক্ষিণ আফগানিস্তানের মোল্লা মোহাম্মদ ওমর ও তাঁর সহযোগীরা একটি নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা নেটওয়ার্ক এবং সাবেক যোদ্ধাদের ওপর ভিত্তি করে তালেবানের প্রাথমিক সংগঠন গড়ে ওঠে। তাদের প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল যুদ্ধবাজদের অবসান, আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং ধর্মীয় নৈতিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তবে এর পাশাপাশি আন্দোলনের দ্রুত বিস্তার আঞ্চলিক কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।

১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়। হেলমান্দ ও নিমরোজসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রভাব বিস্তার, সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতার প্রেক্ষাপটে তালেবানের প্রতি পাকিস্তানের সমর্থন আরও জোরদার হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে একটি স্থানীয় ধর্মীয় আন্দোলন দ্রুত একটি শক্তিশালী সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগঠনে রূপ নেয়।

তালেবানের উত্থানের সঙ্গে হাক্কানি নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন মুজাহিদিন কমান্ডারের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এসব গোষ্ঠীর আনুগত্য সবসময় এক জায়গায় স্থির ছিল না। কেউ পাকিস্তানের সঙ্গে, কেউ পশ্চিমা বা উপসাগরীয় শক্তির সঙ্গে এবং কেউ নিজস্ব স্থানীয় ক্ষমতার ভিত্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখত। ফলে আফগান যুদ্ধক্ষেত্রে আদর্শ, স্থানীয় স্বার্থ ও গোয়েন্দা পৃষ্ঠপোষকতা প্রায়ই পাশাপাশি চলেছে।

১৯৯৬ সালে তালেবান কাবুল দখল করলে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। এই স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ এর মাধ্যমে তালেবান শুধু একটি অভ্যন্তরীণ আফগান শক্তি নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পরিচিতি পায়।

মোল্লা মোহাম্মদ ওমরের ব্যক্তিত্বও তালেবানের প্রতিষ্ঠাকালীন রাজনৈতিক বয়ানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। তাঁকে একজন কঠোর, ধর্মপরায়ণ এবং দক্ষিণ আফগানিস্তানের উপজাতীয় ও ধর্মীয় সমাজের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত নেতা হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভাবমূর্তির আড়ালে ছিল প্রশিক্ষণ শিবির, সীমান্তপারের নেটওয়ার্ক, অর্থায়ন, কমান্ডার এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সম্পর্কের একটি জটিল কাঠামো।

এই ইতিহাস বর্তমান তালেবান শাসনকে বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। তালেবানকে যদি কেবল আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ একটি রাজনৈতিক-ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সংগঠনটির দীর্ঘস্থায়িত্বের বড় একটি অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। পরাজয়ের পরও সংগঠনটি টিকে ছিল আশ্রয়, অর্থায়ন, মতাদর্শ, সীমান্তপারের নেটওয়ার্ক এবং রাজনৈতিক অস্পষ্টতার ওপর ভর করে।

২০০১ সালের পরের ঘটনাপ্রবাহও এই কাঠামোর অস্তিত্বকে সামনে আনে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তালেবানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিলেও সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা পুনর্গঠিত হওয়ার সুযোগ পায়। আফগান-পাকিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকায় বিভিন্ন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা নিজেদের সংগঠিত করে এবং দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করে।

২০০১ সালের পর মোল্লা ওমরের অবস্থান ও চলাফেরা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব ঘটনাকে ঘিরে বিতর্ক থাকলেও বৃহত্তর বাস্তবতা ছিল স্পষ্ট—সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো তালেবানের নেতৃত্বকে রাজনৈতিক আশ্রয়, সামাজিক আড়াল এবং কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে বলে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন।

তাই ২০২১ সালে তালেবানের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনকে আকস্মিক কোনো রাজনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে দেখলে ইতিহাসের বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। এটি ছিল বহু দশক ধরে অমীমাংসিত একটি আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ফল। তালেবানের শিকড় ছিল প্রক্সি কৌশল ও আঞ্চলিক পৃষ্ঠপোষকতায়, তাদের টিকে থাকার পেছনে ছিল আশ্রয় ও নেটওয়ার্ক, আর বর্তমান হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার নেতৃত্বাধীন কঠোর শাসনব্যবস্থায় সেই গোপনীয়তা ও কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার সংস্কৃতিরই ধারাবাহিকতা দেখা যায়।

আফগানিস্তানের ট্র্যাজেডিকে প্রায়ই অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও গোষ্ঠীগত সংঘাতের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু সেটিই পুরো সত্য নয়। এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বিদেশি শক্তিগুলো বারবার আফগানিস্তানকে নিজেদের কৌশলগত সীমান্ত ও প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করেছে, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নয়।

আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বহিরাগত শক্তির দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা এবং প্রক্সি রাজনীতির উত্তরাধিকার নিয়ে সৎভাবে আলোচনা না হলে তালেবানের উত্থান, টিকে থাকা এবং ২০২১ সালের ক্ষমতা দখলের প্রকৃত ইতিহাস কখনোই সম্পূর্ণভাবে বোঝা সম্ভব নয়।

novelonlite28
umchltd