ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬ 

পাকিস্তানে খ্রিস্টান বৃদ্ধকে হত্যা : দুই বছরেও বিচার মেলেনি

ঢাকা এজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১:৩৭, ৫ জুন ২০২৬

শেয়ার

পাকিস্তানে খ্রিস্টান বৃদ্ধকে হত্যা : দুই বছরেও বিচার মেলেনি

পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের সারগোধায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এক নৃশংস গণপিটুনির ঘটনায় নিহত খ্রিস্টান নাগরিক নাজির (লাজার) মাসিহের পরিবার দুই বছর পরও বিচার ও ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায় রয়েছে।

২০২৪ সালের ২৫ মে সারগোধার মুজাহিদ কলোনিতে প্রায় দুই হাজার মানুষের একটি উন্মত্ত জনতা নাজির মাসিহের পরিবারের বাড়ি ও জুতার কারখানায় হামলা চালায়। অভিযোগ ওঠে, তিনি পবিত্র কোরআনের কিছু পৃষ্ঠা অবমাননা করেছেন। স্থানীয় একটি মসজিদ থেকে এ অভিযোগ প্রচার হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।

হামলাকারীরা পরিবারের বাড়ি ও কারখানা ভাঙচুর করে এবং পরে কারখানায় আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ পরিবারের নয় সদস্যকে উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও ৭৪ বছর বয়সী নাজির মাসিহ জনতার হাতে ধরা পড়েন। তাকে ইট, পাথর ও লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর ২০২৪ সালের ২ জুন রাতে তিনি মারা যান।

ঘটনার পর পাকিস্তানজুড়ে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, ক্যাথলিক বিশপ ও মানবাধিকারকর্মীরা নিহতের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং প্রশাসনের কাছে ন্যায়বিচারের দাবি জানান।

তবে নিহতের ছেলে সুলতান গিল অভিযোগ করেন, দুই বছর পার হলেও তাদের পরিবার এখনো বিচার ও প্রতিশ্রুত ক্ষতিপূরণ পায়নি।

তিনি বলেন, “ঈদুল আজহার সময় আমাদের পুরোনো ক্ষত আবারও তাজা হয়ে উঠেছে। সেই দিনের নির্মমতা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমরা এখনো নিরাপদ বোধ করি না। স্বাধীনভাবে চলাফেরা বা কথা বলার আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি।”

গিল জানান, হামলার পর পরিবারকে শহর ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হয়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে তার দুই সন্তান পড়াশোনা বন্ধ করে কাজ শুরু করতে বাধ্য হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কারখানার জন্য প্রশাসন ১২ লাখ পাকিস্তানি রুপি ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ দেওয়া হয়নি।

এদিকে সারগোধা পুলিশ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে প্রায় ৪৫০ অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে এবং ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করে। তবে মানবাধিকার সংগঠন **অর্গানাইজেশন ফর লিগ্যাল এইডের** পরিচালক সুনীল কালিমের মতে, গ্রেপ্তারকৃত সবাই কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জামিনে মুক্তি পেয়ে যায়।

তিনি বলেন, “অভিযুক্তদের জামিনের বিরুদ্ধে আমরা আইনি চ্যালেঞ্জ করেছিলাম, কিন্তু সফল হইনি। স্বাধীন প্রত্যক্ষদর্শীর অভাব এবং বিচার প্রক্রিয়ায় অনীহার কারণে এ ধরনের মামলায় দোষীদের শাস্তি পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।”

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, পাকিস্তানের ধর্ম অবমাননা আইন প্রায়ই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয় এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না।

লাহোরভিত্তিক গবেষণা ও অধিকার সংগঠন সেন্টার ফর সোশ্যাল জাস্টিস-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানে বিচারবহির্ভূতভাবে অন্তত ২৬ জন খ্রিস্টান নিহত হয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, নাজির মাসিহ হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে না পারা পাকিস্তানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

novelonlite28
umchltd