চীনে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে দাবি উঠেছে। বিশেষ করে তরুণ চাকরিপ্রার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়-স্নাতক, গিগ কর্মী, ছাঁটাই হওয়া শ্রমিক এবং সহায়তাহীন বয়স্ক মানুষ এই সংকটে বেশি পড়ছেন বলে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেনঝেনের মতো চীনের অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ শহরগুলোতে আকাশচুম্বী ভবন ও আধুনিক নগরজীবনের আড়ালে অনেক মানুষকে রেলস্টেশন, সেতুর নিচে, মেট্রো স্টেশন ও পার্কে রাত কাটাতে হচ্ছে বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কোথাও কোথাও তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত সেবা কেন্দ্রে বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই, খাবার ও পানির জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর নামে একটি জরিপের উল্লেখ করে দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ সালের আগস্ট নাগাদ দেশটিতে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ৭৫ লাখে পৌঁছেছে, যা ২০২০ সালের তুলনায় পাঁচ গুণ। তবে এই সংখ্যার উৎস, জরিপের পদ্ধতি ও তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই সংখ্যাটিকে নিশ্চিত সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনটির দাবি অনুযায়ী, গৃহহীন মানুষের একটি বড় অংশ তরুণ। তাদের মধ্যে ৬১ শতাংশের বেশি বয়স ৩৩ বছরের নিচে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চাকরির সংকট, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এবং অনিশ্চিত আয়ের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক, ডেলিভারি কর্মী ও সাবেক অফিসকর্মীদের একটি অংশ আবাসন সংকটে পড়ছেন বলে এতে বলা হয়।
কর্মসংস্থান সংকট ও বাড়িভাড়ার চাপ
চীনের অন্যতম শিল্পাঞ্চল গুয়াংডংয়ে কারখানাগুলোতে অর্ডার কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের অনেকে অনিয়মিত ও স্বল্পমেয়াদি কাজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। অভিবাসী শ্রমিক ও খাদ্য সরবরাহকারী কর্মীদের কেউ কেউ বাড়িভাড়া বহন করতে না পেরে সেতুর নিচে কিংবা অন্যান্য উন্মুক্ত স্থানে রাত কাটাচ্ছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতেও রেলস্টেশন ও অন্যান্য জনসমাগমস্থলে বেকার তরুণদের রাত কাটানোর দৃশ্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব দৃশ্যকে কেন্দ্র করে বেকারত্ব, আবাসন ব্যয় এবং আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের বাইরে চলে যাওয়া মানুষের দুরবস্থা নিয়ে অনলাইনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
একটি ঘটনায় সেতুর নিচে ঘুমানো এক তরুণ খাবার কেনার জন্য নিজের মোবাইল ফোন বিক্রি করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আরেক চাকরিপ্রার্থী পাঁচ দিন চেষ্টা করেও কাজ না পেয়ে পার্কে রাত কাটানোর কথা বিবেচনা করেছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
ঋণ ও পারিবারিক সহায়তার সংকট
প্রতিবেদনটিতে গৃহহীন হয়ে পড়া মানুষকে মোটামুটি তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম শ্রেণিতে রয়েছেন বেকার শ্রমিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক, ছাঁটাই হওয়া কর্মী ও গিগ কর্মীরা। দ্বিতীয় শ্রেণিতে রয়েছেন ঋণের চাপে থাকা মানুষ—যাদের মধ্যে আবাসন, গাড়ি ও অনলাইন ঋণের দায় রয়েছে। আয় বন্ধ হয়ে গেলে তাদের আর্থিক পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়।
তৃতীয় শ্রেণিতে রয়েছে বয়স্ক ও পারিবারিক সহায়তাহীন মানুষ। প্রতিবেদনের একটি হিসাব অনুযায়ী, গৃহহীনদের প্রায় ২৫ শতাংশ বয়স্ক নাগরিক। পরিবার থেকে আর্থিক সহায়তা না পাওয়া এবং পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষার অভাব তাদের পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে বলে এতে বলা হয়েছে।
সরকারি সহায়তা নিয়ে প্রশ্ন
চীনের বিভিন্ন কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত সেবা কেন্দ্রকে অসহায় মানুষের জন্য সহায়তার জায়গা হিসেবে তুলে ধরা হলেও এসব কেন্দ্রের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে প্রতিবেদনটি। কিছু কেন্দ্রে কর্মীর অনুপস্থিতি, সীমিত সেবা এবং প্রবেশাধিকারে বিধিনিষেধ থাকার অভিযোগও এতে উঠে এসেছে।
একটি ঘটনায় তীব্র গরমে অসুস্থ হয়ে পড়া এক ব্যক্তিকে একটি সেবা কেন্দ্রে পানি দিতে অস্বীকার করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। অন্য একটি কেন্দ্রে গিয়ে কোনো কর্মী বা কার্যকর সেবা পাওয়া যায়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই অবশ্য প্রয়োজন।
সমালোচকদের একটি অংশের মতে, শুধু সাময়িক খাবার, পানি বা আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে গৃহহীনতার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। স্থায়ী কর্মসংস্থান, সাশ্রয়ী আবাসন এবং কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে সমস্যাটি থেকেই যাবে।
অর্থনীতির পরিবর্তনে নতুন চাপ
চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে আসা, বেসরকারি ব্যবসায় সংকোচন এবং কর্মসংস্থানের ওপর চাপের সঙ্গে গৃহহীনতার বিষয়টিকে যুক্ত করেছে প্রতিবেদনটি। ছোট ব্যবসা গড়ে তোলা কিছু দম্পতি ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর খাদ্য সরবরাহ ও রাইড-হেইলিংয়ের মতো অনিশ্চিত পেশায় যেতে বাধ্য হয়েছেন বলেও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত ব্যবহার ভবিষ্যতে কিছু খাতে কর্মসংস্থানের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
চীনের বড় শহরগুলোতে দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বেকারত্ব, আবাসন ব্যয় এবং সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নও যে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, গৃহহীনতা নিয়ে প্রকাশিত এসব প্রতিবেদন সেই বিতর্ককে সামনে এনেছে। তবে চীনে গৃহহীন মানুষের প্রকৃত সংখ্যা এবং সংকটের পরিধি নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।
আরও পড়ুন:









