ফ্রান্সের এভিয়ানে অনুষ্ঠিতব্য ২০২৬ সালের জি-৭ সম্মেলনে ভারতকে অতিথি দেশ হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে ভারতের অংশগ্রহণের সংখ্যা দাঁড়াল ১৩-তে, আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য এটি হবে ২০১৯ সালের পর সপ্তমবারের মতো ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের ধারাবাহিক উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে তুলে ধরে—বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাগুলোতে ভারতকে উপেক্ষা করা এখন আর সম্ভব নয়। যদিও দেশটি এখনও বিশ্বের উন্নত শিল্পোন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর এই বিশেষ জোটের সদস্য নয়, তবুও জি-৭-এর কাছে ভারতের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
ভারতকে প্রথম জি-৭ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানায় ফ্রান্স, ২০০৩ সালে। এরপর থেকে দেশটির নিয়মিত উপস্থিতি দুটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছে: ভারত কেন সদস্য না হয়েও বারবার আমন্ত্রিত হচ্ছে এবং এর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব স্বীকৃত হওয়া সত্ত্বেও কেন এখনও জোটের বাইরে রয়েছে?
পর্যবেক্ষকদের মতে, এর উত্তর নিহিত রয়েছে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ভারতের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার মধ্যে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের সম্মেলনের ক্ষেত্রে ভারত-ফ্রান্স সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ইউরোপে ফ্রান্সকে ভারতের অন্যতম ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখা হয়।
চলতি বছরে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ভারত সফর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে সহযোগিতা, ‘ভারত ইনোভেটস ইন ফ্রান্স’ কর্মসূচির সূচনা এবং ২০২৬ সালকে ‘ভারত-ফ্রান্স উদ্ভাবন বর্ষ’ হিসেবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত—দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
রাফাল যুদ্ধবিমান ক্রয় চুক্তি, যৌথ নৌ-মহড়া, সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা, সবুজ জ্বালানি, শ্রমিক চলাচল ও মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দিল্লি ও প্যারিসের সহযোগিতা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ফ্রান্স আয়োজিত জি-৭ সম্মেলনে ভারতের আমন্ত্রণকে অনেকেই স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
তবে ভারতের গুরুত্ব কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমানে দেশটি ব্রিকসের ২০২৬ সালের সভাপতিত্ব করছে এবং একই সঙ্গে ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থ, খাদ্য নিরাপত্তা, ঋণ সংকট, জলবায়ু ন্যায়বিচার, জ্বালানি রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার নিয়ে ভারতের অবস্থান বহু দেশের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত একদিকে উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি, অন্যদিকে উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিনিধি এবং একই সঙ্গে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এই অনন্য অবস্থান দেশটিকে বৈশ্বিক পরিসরে একটি বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।
এদিকে ভারতের নিয়মিত আমন্ত্রণকে অনেকেই চীনের সঙ্গে তুলনা করে দেখছেন। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও চীন জি-৭-এর নিয়মিত অতিথি নয়। বরং জি-৭-এর সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্ক নানা ইস্যুতে উত্তেজনাপূর্ণ। ফলে ভারতের ধারাবাহিক উপস্থিতি প্রমাণ করে যে পশ্চিমা শক্তিগুলো এশিয়ার দুই বৃহৎ শক্তিকে ভিন্ন দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ভারতের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, জি-৭-এর জন্য ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করা এখন প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। অনেকের মতে, আজকের বাস্তবতায় ভারতের চেয়ে জি-৭-এরই ভারতের প্রয়োজন বেশি।
আরও পড়ুন:








