মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে গত দুই বছরে কূটনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করেছে পাকিস্তান। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি (এসএমডিএ) স্বাক্ষর এবং ২০২৬ সালের আগস্টে তুরস্ক ও সৌদি আরবের সঙ্গে মক্কা চুক্তিতে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা রাজনীতিতে নতুন অবস্থান তৈরি করেছে ইসলামাবাদ। তবে প্রশ্ন উঠেছে, সৌদি আরবের নিরাপত্তা রক্ষায় পাকিস্তান কি শেষ পর্যন্ত সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে?
সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক সহযোগিতার ইতিহাস কয়েক দশকের পুরোনো। ষাটের দশকে সৌদি বিমানবাহিনী ও স্থলবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিতে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েনের মধ্য দিয়ে এ সহযোগিতার সূচনা। ১৯৬৯ সালে দক্ষিণ ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সংঘাতে সৌদি পাইলটদের সহায়তা করেন পাকিস্তানি পাইলটরা। ১৯৭৯ সালে মক্কার পবিত্র মসজিদে জিম্মি সংকটের সময়ও সৌদি আরবকে নিরাপত্তা ও সামরিক পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করে পাকিস্তান।
১৯৮২ সালে দুই দেশের মধ্যে প্রথম দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে সৌদি আরবে পাকিস্তানি সামরিক সদস্যদের প্রশিক্ষক ও উপদেষ্টা হিসেবে মোতায়েনের বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ও সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তান উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সেনা মোতায়েন করেছিল।
তবে ২০১৫ সালে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত শুরু হলে ভিন্ন অবস্থান নেয় ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের পার্লামেন্ট সর্বসম্মতিক্রমে দেশটিকে ওই সংঘাতে নিরপেক্ষ থাকার আহ্বান জানায়। ফলে সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া সত্ত্বেও সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়নি পাকিস্তান।
২০২৬ সালে হুতিদের হামলা নতুন করে বাড়লে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আবারও জটিল হয়ে ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৫ অক্টোবর পাকিস্তান ও তুরস্ক মক্কা চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতায় যুক্ত হতে সম্মত হয়। ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের আদলে তৈরি এ চুক্তির মূলনীতি হলো, জোটের কোনো একটি সদস্যের ওপর হামলা হলে তা সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। কার্যত সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পরিধি বাড়িয়ে এতে তুরস্ককে যুক্ত করা হয়েছে।
২০২৬ সালের গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার সূচক অনুযায়ী, তিন দেশের সম্মিলিত সামরিক সক্ষমতার মধ্যে রয়েছে প্রায় ১৪ লাখ সক্রিয় সেনাসদস্য, ৩ হাজার ৪০০ সামরিক বিমান, ৬ হাজার ট্যাংক এবং প্রায় ৩৪০টি নৌ-সামরিক সম্পদ। সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের সামরিক শক্তি ও পারমাণবিক সক্ষমতা—এই সমন্বয়কে আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে চুক্তিতে অংশ নিলেও পাকিস্তান ও তুরস্কের ভূমিকা এখন পর্যন্ত মূলত প্রতিরক্ষামূলক। পাকিস্তান সৌদি বাহিনীকে সহায়তা, নজরদারি ও গোয়েন্দা কার্যক্রমে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে আইনগত সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তুরস্ক সরাসরি সামরিক সংঘাতে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে প্রযুক্তি ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের মধ্যে নিজেদের ভূমিকা সীমিত রেখেছে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফও বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। জিও নিউজকে তিনি বলেন, পাকিস্তান ও তুরস্কের বাহিনী সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। গোয়েন্দা নজরদারিসহ বিভিন্ন কাজে তারা যুক্ত থাকলেও মূল যুদ্ধ পরিচালনা করছে সৌদি আরবের নিজস্ব বাহিনী।
সৌদি আরবের নিরাপত্তায় পাকিস্তানের প্রকৃত অঙ্গীকার নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এসএমডিএ স্বাক্ষরের পর সৌদি আরবে সেনা পাঠানোর বিষয়ে ইসলামাবাদের সম্মতি দিতে এক বছরের বেশি সময় লেগেছে। এমনকি এখনো হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি স্থলযুদ্ধে অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়নি পাকিস্তান। বরং বিমান হামলা, নজরদারি ও প্রতিরক্ষামূলক সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে দেশটি।
এর পেছনে রয়েছে পাকিস্তানের নিজস্ব নিরাপত্তা উদ্বেগ। আফগানিস্তানের সঙ্গে পশ্চিম সীমান্তে উত্তেজনা এবং ভারতের সঙ্গে পূর্ব সীমান্তের বিরোধ সামাল দিতে ব্যস্ত ইসলামাবাদ। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের হয়ে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়ালে পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত মনোযোগ বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া ইরানের বিষয়টিও পাকিস্তানের জন্য বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। হুতিরা শিয়াপন্থী গোষ্ঠী এবং ইরানের উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়ে থাকে। অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের প্রায় ৯০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। পাকিস্তানের জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ শিয়া মুসলিম হওয়ায় ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অবস্থান দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও সংবেদনশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
ইরানবিরোধী কোনো আঞ্চলিক সামরিক জোটে পাকিস্তানের সক্রিয় অংশগ্রহণকে তেহরান নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসেবে দেখতে পারে। এর ফলে বেলুচিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা কিংবা আন্তসীমান্ত সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করলেও পাকিস্তান এখনো সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে সতর্ক। রিয়াদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা—এই দুই বিপরীতমুখী স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষাই এখন ইসলামাবাদের প্রধান কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। ফলে সৌদি আরবের পাশে সামরিকভাবে দাঁড়ালেও পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত কতটা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত, তা এখনো অনিশ্চিত।
আরও পড়ুন:









