আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সম্পর্ক ক্রমেই সংঘাতময় হয়ে উঠছে। শরণার্থী বিতাড়ন, সীমান্ত নিরাপত্তা, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং দীর্ঘদিনের কৌশলগত অবিশ্বাসকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, তালেবানবিরোধী পাকিস্তানি অবস্থান প্রত্যাশিত ফল দেওয়ার বদলে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারকে আঞ্চলিকভাবে আরও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে এবং দেশটির অভ্যন্তরে তাদের অবস্থানও শক্তিশালী করছে।
২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের বড় ধরনের অবনতি ঘটে। তালেবান নেতৃত্বের অভিযোগ, অতীতে পাকিস্তান নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে তালেবানকে ব্যবহার করেছে এবং আফগানিস্তানকে নিজেদের প্রভাববলয়ের অধীন রাখার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে, পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আফগান তালেবানের জাতীয়তাবাদী অবস্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে ‘গ্রেটার পশতুনিস্তান’ ধারণার পুনরুত্থান পাকিস্তানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা উদ্বেগ।
দুই দেশের বর্তমান বিরোধের অন্যতম প্রধান কারণ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি। পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগানিস্তানের তালেবান সরকার টিটিপিকে আশ্রয় ও সহযোগিতা দিচ্ছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে পাকিস্তান এখন পর্যন্ত সুস্পষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপরীতে তালেবান নেতৃত্ব টিটিপিকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
গত দুই দশকে টিটিপি পাকিস্তানের জন্য বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ২০১৪ সালে পেশোয়ারের একটি স্কুলে ভয়াবহ হামলার পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী টিটিপির বিরুদ্ধে ‘জার্ব-ই-আজব’ অভিযান শুরু করে। এর ফলে টিটিপির বিভিন্ন অংশ আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকায় চলে যায়। তাদের কিছু অংশ তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে, আবার কিছু গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রভিন্স বা আইএসকেপি গঠন করে।
আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে টিটিপির অবস্থানকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের সামরিক অভিযানও দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করেছে। পাকিস্তানের দাবি, সীমান্তের ওপারে টিটিপির ঘাঁটিতে অভিযান চালানো প্রয়োজন। অন্যদিকে, তালেবান সরকার এসব পদক্ষেপকে আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে গত কয়েক বছরে আফগানিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলোর সীমান্তপারের সন্ত্রাসী হামলায় সরাসরি সম্পৃক্ততার ব্যাপক প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ব্যতিক্রম হিসেবে আইএসকেপির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। মস্কোর ক্রোকাস সিটি হল হামলা এবং মধ্য এশিয়ার কয়েকটি সীমান্তে সংঘর্ষের সঙ্গে আইএসকেপির নাম উঠে আসার পর রাশিয়া, মধ্য এশিয়ার দেশগুলো ও চীন তালেবান সরকারের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়িয়েছে।
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের আরেকটি বিরোধের বিষয় দোরান্ড লাইন। পূর্ববর্তী আফগান সরকারগুলোর মতো তালেবানও এই সীমারেখাকে দুই দেশের আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। পশতুন অধ্যুষিত পাকিস্তানের কিছু অঞ্চল নিয়ে আফগানিস্তানের ঐতিহাসিক দাবিও দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলছে।
২০০১ সালের পর থেকে পাকিস্তান বিভিন্ন সময়ে আফগান শরণার্থীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে। দুই দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে এসব প্রত্যাবাসনের মাত্রারও সম্পর্ক রয়েছে। ২০১৪-১৫ সালে টিটিপির পুনরুত্থান এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির পর ২০১৬ সালে প্রায় ছয় লাখ আফগানকে পাকিস্তান থেকে ফেরত পাঠানো হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফগান শরণার্থীদের বিষয়ে পাকিস্তানের নীতি আরও কঠোর হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ক্ষমতায় থাকার সময় পাকিস্তানে জন্ম নেওয়া আফগান শরণার্থীদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার পরিকল্পনা এবং তাদের ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ দেওয়ার কথা বলেছিলেন। ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর তালেবানের ক্ষমতায় ফিরে আসাকে তিনি ইতিবাচকভাবে মন্তব্য করেছিলেন।
তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার তৎকালীন মহাপরিচালকের কাবুল সফরও দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হয়। একই সময়ে পাকিস্তান তালেবান সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন তৈরির উদ্যোগ নেয়।
তবে পরবর্তীতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যায়। ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) পশতুন অধ্যুষিত খাইবার পাখতুনখাওয়ায় শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখে। ২০২৩ সালের ৯ মে ইমরান খানের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে সহিংসতার পর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার আফগান অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পায় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
শরণার্থী বিতাড়নের পেছনে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কারণ দেখিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির বক্তব্য, আফগান নাগরিকদের একটি অংশ টিটিপিকে সহায়তা করছে এবং বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর কারণে রাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হচ্ছে। তবে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই পদক্ষেপের পেছনে রাজনৈতিক বিবেচনাও কাজ করছে।
পাকিস্তানে থাকা আফগান শরণার্থীদের একটি বড় অংশ কয়েক দশক ধরে দেশটিতে বসবাস করছে। তাদের অনেকে পাকিস্তানেই জন্মগ্রহণ করেছে এবং কখনো আফগানিস্তানে বসবাস করেনি। ফলে প্রজন্মের পরিবর্তনের সঙ্গে তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ও জটিল হয়ে উঠেছে।
অতীতে আফগান শরণার্থীদের পাকিস্তান আফগান সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও শরণার্থী সংকট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের জন্য এই জনগোষ্ঠীর কৌশলগত গুরুত্ব কমে গেছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
আফগানিস্তান-পাকিস্তান উত্তেজনা কমাতে রাশিয়া ও চীনসহ কয়েকটি আঞ্চলিক শক্তি বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাদের কৌশলে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানো, মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং আইএসকেপির মতো প্রতিদ্বন্দ্বী জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহযোগিতা নিশ্চিত করতে এসব দেশ তালেবান সরকারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াচ্ছে।
ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি তালেবান সরকারও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে নিজস্ব কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার সুযোগ পাচ্ছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আফগান শরণার্থীদের জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো এবং পাকিস্তানের সামরিক অভিযানে বেসামরিক হতাহতের অভিযোগ শেষ পর্যন্ত টিটিপির জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় টিটিপির হামলার মাত্রা ও ঘনত্ব বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
একই সঙ্গে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের কঠোর অবস্থান দেশটির অভ্যন্তরে তালেবানের প্রতি জনসমর্থন বাড়াতে পারে। পাকিস্তান সরকার বর্তমানে পশতুন জাতীয়তাবাদী দল ও ধর্মীয় নেতাদের কাছ থেকেও আফগানিস্তান ও আফগান শরণার্থীদের বিষয়ে নমনীয় নীতি গ্রহণের চাপের মুখে রয়েছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হলে পাকিস্তানের সামনে দুটি কঠিন পথ তৈরি হতে পারে। একটি হলো আফগানিস্তানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করা, যাতে নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা যায়। তবে এতে তালেবান আবারও সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠনে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অন্য পথ হলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জনে প্রক্সি গোষ্ঠীর ব্যবহার থেকে সরে এসে দ্বিপক্ষীয় বিরোধ কূটনৈতিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করা।
দুই ক্ষেত্রেই বড় ধরনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ফলে আফগানিস্তান ইস্যুতে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের কৌশল এখন এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে নিরাপত্তা, শরণার্থী সংকট, সীমান্ত বিরোধ এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন:









