ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬ 

মুসলিম অধ্যুষিত আফগানিস্তানে পাকিস্তানি সেনার লাগামহীন বর্বরতা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮:১৬, ২ এপ্রিল ২০২৬

শেয়ার

মুসলিম অধ্যুষিত আফগানিস্তানে পাকিস্তানি সেনার লাগামহীন বর্বরতা

মুখে ইসলামের কথা বললেও আসলে কোনও ধর্মই মানে না পাকিস্তান। পবিত্র রমজান মাসে মুসলিম প্রধান আফগানিস্তানের চিকিৎসালয়ে বিমান হামলা চালিয়ে ইসলামাবাদ বুঝিয়ে দিল তারা এখনও মানবতাবিরোধী। একাত্তরে বাংলাদেশে যেভাবে নৃশংসতা দেখিয়েছিল পাকিস্তানি সেনা, ঠিক সেভাবেই কাবুলেও হামলা চালাচ্ছে মানবতাবিরোধী পাকিস্তানি সেনা। যুদ্ধের রীতিনীতি ভঙ্গ করে, সমস্ত আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে গত ১৬ই মার্চ কাবুলের ওমিদ মাদক পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাকিস্তানের বিমান হামলায় স্তম্ভিত গোটা দুনিয়া। ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের আফগান হামলা ইসলামাবাদের অমানবিক আচরন নৃশংস হামলা হিসাবে মানবসভ্যতার জন্যও ভয়ঙ্কর উদাহরণ হিসাবে চিহ্ণিত হয়ে থাকবে।

কাবুলের  ওমিদ মাদক পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাকিস্তানি বিমান হামলায় ৪০০ জনেরও বেশি নিহত এবং ২৫০ জন আহত হয়েছেন।  আফগান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ এক্স হ্যান্ডেলে (সাবেক টুইটার) জানিয়েছেন, নিহতদের মধ্যে নিরপরাধ সাধারণ মানুষ ছাড়াও চিকিৎসাধীন রোগীরাও রয়েছেন।

তিনি এই হামলার নিন্দা করে বলেছেন, রোজার মাসে এধরনের হামলা বর্বরতার নিকৃষ্ট নিদর্শন। এটিই আফগান-পাকিস্তানি সংঘাতের সবচেয়ে মারাত্মক ঘটনা। ওমিদ কেন্দ্রটি দুই হাজার শয্যাবিশিষ্ট একটি মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান। সেখানে মাদকাসক্ত আফগানদের চিকিৎসা করা হয়।

আফগান সরকারের মুখপাত্র আরও বলেছেন, ‘পাকিস্তান বেছে বেছে সাধারণ মানুষের ওপর নৃশংসতা চালাতে হাসপাতাল ও অসামরিক এলাকায় হামলা করছে’।

অথচ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান দুই দেশই মুসলিম প্রধান। শুধু তাই নয় প্রতিবেশী দুই দেশেই সুন্নি মুসলিমরাই সংখ্যাগুরু। তবু দুই সুন্নি মুসলিমরা লড়াইয়ের ময়দানে। আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা না করলেও রাজধানী কাবুলের ওপর সামরিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। সামরিক স্থাপনার বদলে বেসামরিক স্থাপনা ও নিরীহ মানুষদেরই টার্গেট করছে পাকিস্তানি বাহিনী।

তাই প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওমিদে হামলা বিচ্ছিন্ন সামরিক ঘটনা নয়। পাকিস্তান আসলে আফগানিস্তানকে তাদের ‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ’ বা কৌশলগত বলয়ের মধ্যে রাখতেই এধরনের হামলা চালাচ্ছে। নিজেদের দেশের আর্থিক সঙ্কট থেকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি ঘোরাতেও পাকিস্তানের আফগান আক্রমণ একটি কৌশল বলেও তারা মনে করেন। কারণ আর্থিক সঙ্কটের কারণে পাকিস্তানে জ্বালানী ও খাদ্য সামগ্রীর ব্যাপক হাহাকার শুরু হয়েছে।  তাই এখন যুদ্ধের জিগির তুলেছে পাকিস্তান।

আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ইসলামাবাদের অভিযোগ, সেখানকার তালেবান সরকার নাকি জঙ্গিবাদকে মদদ দিচ্ছে। অথচ, এক সময় সেখানকার জঙ্গিদের প্রধান মদদদাতা ছিল পাকিস্তান। এখন তালেবান সরকার প্রায় ৬ হাজার টিটিপি  (তেহরিক–ই–তালেবান পাকিস্তান) যোদ্ধাকে আটক করে শান্তির পথ প্রশস্ত করতে চাইছে। নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে তারা এখন নতুন করে হাতে নিয়েছে আফগানিস্তানকে পুনর্গঠনের কর্মসূচি। তবু পাকিস্তান অমানবিক হামলা চালাচ্ছে। জবাব দিচ্ছে তালেবান সরকারও।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা তথ্য প্রমাণ সহকারে ওমিদে পাকিস্তানি হামলার কথা প্রচার করলেও এখনও অস্বীকার করে চলেছে ইসলামাবাদ। তারা নাকি কোনো বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়নি।  তাদের অভিযানগুলো নাকি সুনির্দিষ্টভাবে সামরিক স্থাপনা এবং সন্ত্রাসীদের সহায়তাকারী অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে।  কিন্তু ইসলামাবাদের এধরনের দাবি পুরোপুরি অসত্য। কারণ শুধু আফগান সরকারই নয়, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনও পাকিস্তানের অমানবিক হামলার প্রমাণ পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী পরিস্থিতি নির্বিশেষে হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্রের ওপর হামলা নিষিদ্ধ। ওমিদের হামলা পাকিস্তানি বর্বরতার জ্বলন্ত উদাহরণ। ইউনাইটেড নেশনস অ্যাসিস্ট্যান্স মিশন ইন আফগানিস্তান বা ইউএনএএমএ-র পরিসংখ্যান বলছে ওমিদের ঘটনা বাদ দিলেও গত ১৫ দিনে পাকিস্তানি সামরিক হামলায় আফগানিস্তানে অন্তত ৭৫ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত ও ১৯৩ আহত হয়েছেন। হতাহতদের অর্ধেকের বেশি নারী ও শিশু।  পাকিস্তান তালেবানদের সঙ্গে সরাসরি সঙ্ঘর্ষে না পেরে নিরীহদেরই টার্গেট করছে।

ওমিদের হামলায় আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষও স্তম্ভিত। তারা সরকারকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। আফগানিস্তানের ক্রিকেটাররাও আন্তর্জাতিক দুনিয়ার কাছে পাকিস্তানি বর্বরতার বিরুদ্ধে সরব হওয়ার ডাক দিয়েছেন।

পাকিস্তানকে সতর্ক করে দিয়ে সেখানকার তারকা ক্রিকেটার আল্লা গজনফর বলেছেন, ‘আফগানিস্তানের ইতিহাস সকলে জানে। যদি সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয় তা পাকিস্তানের পক্ষে ভাল হবে না’।

একই রকমভাবে আরও তিন ক্রিকেটার রশিদ খান, মহম্মদ নবি ও নবীন উল হক হামলার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন।

সামাজিক মাধ্যমে  হামলার কিছু ছবি দিয়ে তারা লিখেছেন, ‘পাকিস্তানের হামলায় আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষের মৃত্যুতে আমরা স্তম্ভিত। সাধারণ মানুষের বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতালে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত যে কোনও হামলাই অপরাধ। রমজানের পবিত্র মাসে এ রকম হত্যালীলা খুবই আতঙ্কের। এতে হিংসা ও ঘৃণা আরও বাড়বে’। এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য রাষ্ট্রপুঞ্জের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তারা।

তারা আরও লিখেছেন, ‘জাতিসংঘ ও অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থার কাছে আমার অনুরোধ, হস্তক্ষেপ করুন। এই কঠিন সময়ে আফগান ভাইবোনদের পাশে আছি। আমরা নিশ্চয়ই এই কঠিন সময় কাটিয়ে উঠব’।

তবে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক শ্বাসরোধকর পরিস্থিতি আফগানিস্তানের কৌশলগত পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করছে। তাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রায় ২০২১-পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরে এসেছে। বাণিজ্য বহর এপ্রিল ২০২৪ থেকে মার্চ ২০২৫-এর মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং আফগান রপ্তানি পরিমাণ ৬৪২ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আফগানিস্তানের ৩৪টি প্রদেশ জুড়ে ৫০০টিরও বেশি উন্নয়ন প্রকল্প চলছে।  পাকিস্তান অর্থনৈতিক অবরোধ চালানোর চেষ্টা করলেও তারা সফল হয়নি। পাকিস্তানের অমানবিক আচরনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে বিভিন্ন দেশ। নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্তানের বিমান হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা করেছে বিভিন্ন দেশ। একটি স্থলবেষ্টিত দেশের ওপর বাণিজ্য অবরোধকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম ও জাতিসংঘ সনদ লঙ্ঘনকারী অর্থনৈতিক জবরদস্তি হিসেবে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে তারা।

আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদকে মদদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে হামলা চালাচ্ছে পাকিস্তান। কিন্তু মুখে যুদ্ধের কথা বলছে না।

বিবিসি-র তরফে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের মুখপাত্র মুশাররফ জাইদিকে প্রশ্ন করা হয়, পাকিস্তান কি আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে? জবাবে মুশাররফ জাইদি বলেছেন, ‘আমাদের যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে না। এটা যুদ্ধ নয়। যুদ্ধ হয় দু'টি দেশের মধ্যে’।

তার আরও সাফাই, ‘পাকিস্তান তার প্রয়োজন অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছে যেন পাকিস্তানের মাটি ও জনগণকে... আফগান মাটি থেকে আসা সন্ত্রাসবাদ থেকে রক্ষা করা যায়’।

কিন্তু পাকিস্তান নিজেই তো বিশ্বের এক নম্বর জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক্‌স অ্যান্ড পিস’ প্রকাশ করেছে ‘বিশ্ব সন্ত্রাস সূচক (গ্লোবাল টেরোরিজম ইনডেক্স) ২০২৬’-এর তালিকা। সেই তালিকায় আবার এক নম্বর স্থানে রয়েছে পাকিস্তান!

তাদের তথ্য অনুযায়ী গত বছর মোট ১,০৪৫টি জঙ্গিহানার ঘটনায় ১,১৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এমন নজির বিশ্বে আর কোনও দেশের নেই।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ সালের তুলনায় ২০২৫-এ সেখানে সন্ত্রাসবাদী হামলার ঘটনা বেড়েছে ছ’গুণ। শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের তালিকায় গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রয়েছে পাকিস্তান।

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একান্ত অনুগত ও  অতি-ডানপন্থী রাজনৈতিক কর্মী লরা লুমার বলেছেন, গোটা বিশ্বে পাকিস্তান সবচেয়ে বেশি রপ্তানি করে ‘ইসলামিক সন্ত্রাসবাদ’। তার মতে, শাহবাজ শরিফের সরকারের সঙ্গে মোটেই যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা উচিত নয়।

আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন গবেষণা সংস্থা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন বলেছে, ‘বিশ্বজুড়ে বেশ কয়েকটি জঙ্গি হামলার পেছনে পাকিস্তানের হাত রয়েছে। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সঙ্কটের মূলে রয়েছে পাকিস্তানের নীতি। ইসলামাবাদ নির্দিষ্ট জঙ্গি গোষ্ঠীগুলিকে সক্রিয় রাখার সঙ্গে জড়িত। জঙ্গিদের প্রতি তাদের রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধান নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি করেছে। শুধু অবহেলা নয়, বরং রাষ্ট্র ও তার গোয়েন্দা সংস্থাগুলির জটিল ও কৌশলগত প্ররোচনার ইঙ্গিত মিলেছে’।

নিজেদের দোষ ঢাকতে এখন পাকিস্তানি সেনা আফগানিস্তানের ওপর নৃশংস হামলা চালাচ্ছে। নিরীহ আফগানদের চাঁদমারি করতেও তাদের হাত কাঁপছে না। পবিত্র রমজান মাসেও মুসলিম নারী ও শিশুরা পাকিস্তানি সেনার হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। ঈদের আনন্দ ফিকে হয়ে গিয়েছে পাকিস্তানি বর্বরতায়। ঢাকায় একাত্তরে পাকিস্তানি অমানবিকতার ছবি ফের ফুটে উঠছে সুদূর কাবুলেও।
 

novelonlite28
umchltd