স্থানীয় নির্বাচনে সক্ষমতার জানান দিতে চায় এনসিপি
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত : ১১:৫৮ এএম, ২ নভেম্বর ২০২৬ সোমবার
দল হিসেবে যাত্রার ২০ মাসের মাথায় প্রথমবারের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এর মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের সক্ষমতার জানান দিতে চায় দলটি।
এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ নেয় এনসিপি। তবে এবার এককভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার পথে হাঁটছে দলটি। এ লক্ষ্যে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে নানা প্রস্তুতি। এর অংশ হিসেবে ১৯৫ সদস্যের পুনর্গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষস্থানীয় কিছু পদে রদবদল করা হয়েছে। ইউনিয়ন কমিটি ও ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্টদের সামগ্রিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এনসিপি নেতারা বলছেন, চাঁদাবাজি ও দখলদারির বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান তারা। ফলে সারা দেশে সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তৃণমূলে ধাপে ধাপে সাংগঠনিক কাঠামো ছড়িয়ে দেওয়ার পর রাজনৈতিক কর্মসূচি আরও জোরদার করা হবে।
স্থানীয় সরকারের নির্বাচন প্রতীকবিহীন। তাই তৃণমূলের রাজনীতিতে এই উন্মুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার চ্যালেঞ্জ নিতে চায় এনসিপি। এরই মধ্যে পাঁচটি সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি ১০০টি পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদে মেয়র ও চেয়ারম্যান পদে প্রাথমিকভাবে প্রার্থী বাছাই করেছে দলটি। এ ছাড়া শিগগিরই ৫০০ উপজেলায় আহ্বায়ক কমিটি গঠনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ধাপে ধাপে কমিটি ঘোষণা করা হবে দেশের ৪ হাজার ৬০০ ইউনিয়নে।
রাজধানীর শাহবাগে গত শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) গণবিক্ষোভ করে এনসিপি। বিক্ষোভ-পরবর্তী সমাবেশে ঢাকার দুই সিটিতে দলীয় মেয়রপ্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। ঢাকা দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং উত্তরে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নাম ঘোষণা করেন তিনি।
এর আগে অবশ্য দল থেকে ঢাকা উত্তরে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছিল। পরে ‘কৌশলগত’ কারণে এতে পরিবর্তন আনা হয়।
এ ছাড়া সিলেটে অ্যাডভোকেট আব্দুর রহমান আফজাল এবং রাজশাহীতে মোবাশ্বের আলীকে মেয়রপ্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। কুমিল্লা সিটিতে সম্ভাব্য প্রার্থী জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট তরিকুল ইসলাম।
কেন্দ্রীয় কমিটিতে পুনর্গঠন
স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও দলীয় কাউন্সিল সামনে রেখে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠন করে এনসিপি। আহ্বায়ক পদে নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব পদে আখতার হোসেন বহাল আছেন। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে আগের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন কাঠামোতে আগের কমিটির সাতটি পদ বিলুপ্ত করা হয়েছে।
পুনর্গঠিত কমিটিতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও হাসনাত আবদুল্লাহকে পদোন্নতি দিয়ে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে। সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া হয়েছেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব।
আগের কমিটিতে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন সামান্তা শারমিন ও আরিফুল ইসলাম আদীব। জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ছিলেন আবদুল হান্নান মাসউদ। নতুন কমিটিতে এই তিনজন যুগ্ম আহ্বায়ক হয়েছেন। আর আগের কমিটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব নাহিদা সারোয়ার নিভা এখন যুগ্ম সদস্যসচিব।
পুনর্গঠিত কমিটিতে ২৪ জনকে যুগ্ম আহ্বায়ক ও ছয়জনকে যুগ্ম সদস্যসচিব করা হয়েছে। আগের কমিটিতে কোনো সম্পাদকীয় পদ ছিল না। এবার ৩২টি সম্পাদকীয় পদ দেওয়া হয়েছে। তাদের সঙ্গে এক-দুজন করে সহসম্পাদক আছেন। এর বাইরেও কমিটিতে ১৯ জন সহসম্পাদক রয়েছেন। ৫৮ জনকে সদস্য করা হয়েছে। এ ছাড়া ১১ জনকে সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
২১৭ সদস্যের কমিটি নিয়ে ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যাত্রা করে এনসিপি। বর্তমান পুনর্গঠিত আহ্বায়ক কমিটিতে সদস্য ১৯৫ জন। গত জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তের পর অন্তত ১৮ জন নেতা দলত্যাগ করেন।
দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম হিসেবে পরিচিত রাজনৈতিক পর্ষদে সদস্য রয়েছেন ১৬ জন। নতুন কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়কের পদ পেয়েছেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নাতনি এ কে ফ্লোরা, সাবেক বিএনপি নেতা ইসহাক সরকার ও তারেক এ আদেল।
দলের পুনর্গঠন নিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক ও সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম জানিয়েছেন, সাংগঠনিক বিস্তৃতির লক্ষ্যে কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। নির্বাচনের পর অনেকে দলে যুক্ত হয়েছেন। তাদের দায়িত্ব দিতে পুনর্বণ্টন দরকার ছিল। সামনে কাউন্সিল হবে। এর মধ্য দিয়ে এই কমিটি পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে রূপান্তরিত হবে।
তৃণমূলের প্রস্তুতি ও জোটের হিসাব
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারজিস আলম এশিয়া পোস্টকে জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে ৫০০ উপজেলায় আহ্বায়ক কমিটি গঠনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ৪ হাজার ৬০০ ইউনিয়নে কমিটি গঠন এবং দল-সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী ঘোষণার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রথমে ইউপি নির্বাচন হওয়ায় সেখানে বেশি মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে বলে জানান সারজিস আলম। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক ভিত্তি পর্যালোচনা, দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে আঞ্চলিক সমন্বয় সভা করা হচ্ছে। এসব সভায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছাই ও নির্বাচনি কৌশল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমরা সব রকমের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে চাই।’
এদিকে এনসিপির পৃথক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, জেলা থেকে ওয়ার্ড পর্যায়ের কোনো কমিটিতে ‘রানিং স্টুডেন্ট’ রাখা যাবে না। তারা এনসিপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রশক্তিতে কাজ করবেন। ৩০ বছরের কম বয়সি কাউকে কমিটিতে রাখা যাবে না। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে পরিচিত, মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য, সৎ, দেশপ্রেমিক, সচ্ছল ও সুশিক্ষিত ব্যক্তিদের নেতৃত্বে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে।
ওই নির্দেশনা অনুযায়ী মহানগর ও জেলা কমিটি হবে ১০১ সদস্যের। উপজেলা, পৌরসভা ও থানা কমিটি হবে ৭১ সদস্যের। ইউনিয়ন কমিটি ৫১ সদস্যের এবং ওয়ার্ড কমিটি হবে ৩১ সদস্যের।
সিটি নির্বাচনে এককভাবে নিজেদের শক্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিলেও এখনই জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ছে না এনসিপি। ১১ দলীয় জোটের অন্য সদস্যদের সঙ্গেও পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখা হবে।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এনসিপি এককভাবে নির্বাচন করলেও দলের পূর্ববর্তী কার্যক্রম, প্রার্থীর যোগ্যতা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার বিচারে ভালো ফল করবে। প্রতীকবিহীন নির্বাচনে কোনো বিশেষ দল বা মার্কাকেন্দ্রিক আনুগত্য প্রকাশ পাবে না। এতে স্থানীয় রাজনীতিতে স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ তৈরি হবে। বিএনপি ও জামায়াতের মতো দুই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপরীতে এনসিপি প্রার্থীরা ভালো ফল করবে।’
দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, ভোটাররা এনসিপিকে স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে দেখতে চান। সেই স্বতন্ত্র বিবেচনাবোধ থেকেই সুইং ভোটগুলো এনসিপির দিকে আসবে। বিএনপি ও জামায়াত মূলত তাদের নিজস্ব সাংগঠনিক ভোটই পাবে। এনসিপি সাংগঠনিক ভোটের পাশাপাশি সুইং ভোটও পাবে। এই হিসাবে ভোটের লড়াইয়ে এনসিপি ভালো অবস্থানে থাকতে পারে।’
