নিখোঁজ শিক্ষিকার দেহাবশেষ উদ্ধার

টুপটুপে নিহত ১০ জনের মরদেহ হস্তান্তর

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত : ০৮:১৩ পিএম, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ মঙ্গলবার

দুই বান্ধবী গিয়েছিলেন সমুদ্রসৈকতে হাঁটতে। আর রিসোর্টের কক্ষে ঘুমিয়ে ছিলেন স্কুলশিক্ষিকা নাসরিন আক্তার মুক্তা। ভোরের সেই সামান্য সময়ের ব্যবধানই হয়ে উঠল জীবনের শেষ বিচ্ছেদ। দুই বান্ধবী ফিরে এলেও আগুনে পুড়ে যাওয়া রিসোর্ট থেকে আর ফেরা হয়নি মুক্তার।

টানা ১০ দিন নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে নাসরিন আক্তার মুক্তার দেহাবশেষ। 

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুর আড়াইটার দিকে কয়েক ঘণ্টার তল্লাশি শেষে তা উদ্ধার করে পুলিশ। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় দেহাবশেষ অনেকটা কঙ্কালসদৃশ হয়ে পড়েছিল। গলায় থাকা লকেট দেখে স্ত্রীকে শনাক্ত করেন তার স্বামী দেওয়ান ফয়সাল।

এ নিয়ে ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় রিসোর্টটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ জনে। এর আগে মঙ্গলবার সকালে ডিএনএ পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া ১০ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

সোমবার রাতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে আগুনে নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত করার তথ্য জানায়। তবে ওই ১০ জনের মধ্যে ছিলেন না নিখোঁজ স্কুলশিক্ষিকা মুক্তা। তাদের নমুনার সঙ্গে মুক্তার স্বজনদের ডিএনএর মিল না পাওয়ায় তার সন্ধান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

এরপর মঙ্গলবার সকালে উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন পুড়ে যাওয়া রিসোর্টে নতুন করে তল্লাশি শুরু করে পুলিশ। ধ্বংসস্তূপের ঝুঁকিপূর্ণ অংশের পাশাপাশি আশপাশের নালা ও ঝোপঝাড়েও অনুসন্ধান চালানো হয়। 

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার জানান, সোমবার রাতে ডিএনএ পরীক্ষার অনানুষ্ঠানিক তথ্য থেকে একজনের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ার বিষয়টি জানা যায়। এরপর মঙ্গলবার সকাল থেকে আবারও তল্লাশি শুরু করে পুলিশ।

যেভাবে স্ত্রী মুক্তাকে চিনলেন স্বামী ফয়সাল

ঢাকার উপকণ্ঠ সাভারের আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন নাসরিন আক্তার মুক্তা। দুই বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজার বেড়াতে এসে তারা উঠেছিলেন শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টে।

মুক্তার স্বামী ঢাকা জেলা উত্তর ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি ফয়সাল দেওয়ান বলেন , অগ্নিকাণ্ডের দিন ভোরে মুক্তার দুই বান্ধবী সমুদ্রসৈকতে হাঁটতে বের হন। মুক্তা তখন রিসোর্টের কক্ষে ঘুমিয়ে ছিল। বাইরে থাকায় তার দুই বান্ধবী প্রাণে বেঁচে গেলেও আগুনের মধ্যে আটকা পড়ে আর বের হতে পারেনি মুক্তা।

এরপর থেকে তার স্বজনদের অপেক্ষা, খোঁজাখুঁজি আর অনিশ্চয়তা এবং একে একে অন্য নিহতদের পরিচয় শনাক্ত হলেও মুক্তার সন্ধান মিলছিল না বলে জানান তিনি।  অবশেষে ১০ দিন পর ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া তার দেহাবশেষে থাকা গলার লকেট দেখে ফয়সাল সেটি মুক্তার মরদেহ বলে নিশ্চিত করেন।

স্বজনদের কাছে হস্তান্তর ১০ জনের মরদেহ

মুক্তার দেহাবশেষ উদ্ধারের দিনই ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় শনাক্ত হওয়া আগের ১০ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মঙ্গলবার দুপুরের পর কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গের হিমঘর থেকে মরদেহগুলো হস্তান্তর করেন জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান ও পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান।

নিহত ১০ জনের মধ্যে ঢাকার দুটি পরিবারের সদস্য রয়েছেন। তাদের একটি পরিবারের চারজন এবং অন্য পরিবারের ছয়জন।

চার সদস্যের পরিবারটির সদস্যরা হলেন- শ্যামলীতে অবস্থিত গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাহিদুর রহমান (৪১), তার স্ত্রী আফসানা মতিন (৩৬) এবং তাদের দুই মেয়ে রোজাইনা ইনায়া (৯) ও মুনাইনা ইহানা (৬)।

অন্য পরিবারের নিহতরা হলেন- মৌলিতা মেহজাবিন আলভি (১৯), তার কাজিন লায়লা জাহান নাবিলা (২৫) ও ইসরাত জাহান মালিহা (২৭), ফারিয়া কবির (৩৩), ফারিয়ার ছয় বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ ফাইজান নূর এবং ফারিয়ার ভাই মোহাম্মদ নাফিস তেহামি (২৪)। তারা ঢাকার বনশ্রী ও খিলগাঁও এলাকায় বসবাস করতেন।

নাফিস তেহামি ‘জেরিফ’ নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। মৌলিতা মেহজাবিন আলভি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে পপুলেশন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ সায়েন্সেস বিষয়ে পড়াশোনা করতেন। লায়লা জাহান নাবিলা ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ডিএনএ পরীক্ষা করে নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করে। স্বজনদের নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় শনাক্তের পর তাদের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।