দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে চীন
ঢাকা এজ ডেস্ক
প্রকাশিত : ০৩:১৮ পিএম, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ শুক্রবার
চীনের সামরিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ লাওসে নতুন সামরিক বিমানঘাঁটি স্থাপন করেছে বেইজিং। লাওসের রাজধানী ভিয়েনতিয়েনের কাছাকাছি বান কিউন বিমানবন্দরে চীন ও লাওসের যৌথ সহায়তা ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কথা গত সেপ্টেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। বিদেশে সামরিক স্থাপনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এটিই প্রথম ঘাঁটি, যেটিকে চীন প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই স্থাপনা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের সামরিক উপস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রসারণ। এর ফলে প্রতিবেশী দেশ ভিয়েতনামের ওপর কৌশলগত চাপ বাড়তে পারে এবং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, বান কিউন স্থাপনায় প্রায় দুই হাজার মিটার দীর্ঘ রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে এবং ২২টি উড়োজাহাজ রাখার উপযোগী পার্কিং এলাকা রয়েছে। সেখানে দ্রুত নির্মাণকাজ চলারও প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে স্যাটেলাইট চিত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, স্থাপনাটিতে আটটি উড়োজাহাজ রয়েছে। এগুলো চীন ও পাকিস্তানের যৌথভাবে ব্যবহৃত হংডু জেএল-৮ প্রশিক্ষণ ও হালকা আক্রমণকারী বিমান হতে পারে, যা কে-৮ নামেও পরিচিত। এ ছাড়া সেখানে দুই ডজনের বেশি সহায়ক যানবাহন দেখা গেছে। লাওসের বিমানবাহিনীর কাছে এ ধরনের উড়োজাহাজ থাকলেও স্থাপনাটিতে দৃশ্যমান সংখ্যার তুলনায় দেশটির নিজস্ব বহর ছোট। ফলে অতিরিক্ত উড়োজাহাজগুলো নতুন করে কেনা হয়েছে, নাকি চীনের, তা স্পষ্ট নয়।
চীনের দাবি, এই স্থাপনা কেবল লাওসের বিমানবাহিনীর পাইলটদের প্রশিক্ষণ, দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা জোরদার এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহৃত হবে। তবে সমালোচকদের মতে, বিদেশে সামরিক উপস্থিতি নিয়ে চীনের অতীত অবস্থানের সঙ্গে এই উদ্যোগের একটি বৈপরীত্য রয়েছে। কারণ, বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও উপস্থিতির সমালোচনা করে আসছে।
বিদেশে সামরিক উপস্থিতি সম্প্রসারণ
লাওসে নতুন স্থাপনা চীনের ক্রমবর্ধমান বিদেশি সামরিক উপস্থিতির ধারাবাহিক অংশ। ২০১৭ সালে আফ্রিকার জিবুতিতে চীন তার প্রথম বিদেশি সামরিক স্থাপনা প্রতিষ্ঠা করে। বেইজিং তখনও এটিকে সামরিক ঘাঁটির পরিবর্তে মূলত রসদ ও সরবরাহ সহায়তাকেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেছিল। বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে অবস্থিত এই স্থাপনা লোহিত সাগর ও গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের ওপর নজরদারির জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া কম্বোডিয়ার রিয়াম নৌঘাঁটিতে চীনের উপস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ২০২২ সালে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এক প্রতিবেদনে জানায়, ঘাঁটিটির উন্নয়নে চীন কাজ করছে এবং এর কিছু অংশ চীনা সামরিক বাহিনীর একচেটিয়া ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত হতে পারে। প্রথমে চীন ও কম্বোডিয়া এ প্রতিবেদন অস্বীকার করলেও পরবর্তী সময়ে দুই দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘাঁটিটির উদ্বোধন করে। এরপর সেখানে দুই দেশের যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি এবং যৌথ সামরিক মহড়াও দেখা যায়।
থাইল্যান্ড উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত রিয়াম নৌঘাঁটি দক্ষিণ চীন সাগরসহ বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে। লাওসের বান কিউন বিমানঘাঁটি যুক্ত হওয়ায় এই অঞ্চলে চীনের নৌ ও বিমান চলাচল-সহায়ক অবকাঠামোর একটি নতুন সমন্বয় তৈরি হচ্ছে।
ভিয়েতনামের ওপর বাড়তে পারে চাপ
লাওসে চীনের নতুন সামরিক স্থাপনার অন্তত চারটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রভাব রয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
প্রথমত, ভিয়েতনামের পশ্চিমে লাওসের অবস্থান চীনের জন্য দেশটির ওপর কৌশলগত চাপ সৃষ্টির নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। চীন ও ভিয়েতনামের মধ্যে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও ভূখণ্ড ও সামুদ্রিক অধিকার নিয়ে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। নতুন বিমানঘাঁটি এই জটিল সম্পর্ককে আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে।
দ্বিতীয়ত, এই স্থাপনা বিদেশে চীনের সামরিক উপস্থিতিতে বিমানশক্তির নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। জিবুতি ও কম্বোডিয়ায় চীনের আগের স্থাপনাগুলো মূলত নৌবাহিনীকেন্দ্রিক। বিপরীতে, বান কিউন চীনের বিমানবাহিনীকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি সহায়ক অবস্থান দিচ্ছে।
ভবিষ্যতে রানওয়ে সম্প্রসারণ করা হলে সেখানে চীনের নজরদারি উড়োজাহাজ কিংবা বোমারু বিমান পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থলবেষ্টিত দেশ লাওসের দীর্ঘ ও সংকীর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় সামরিক তৎপরতা পর্যবেক্ষণের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে রানওয়ে সম্প্রসারণ কিংবা এ ধরনের উড়োজাহাজ মোতায়েনের কোনো নিশ্চিত পরিকল্পনার তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
প্রচলিত সামরিক ঘাঁটির বিকল্প কৌশল
তৃতীয়ত, লাওসের এই স্থাপনা বিদেশে সামরিক উপস্থিতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চীনের একটি ভিন্ন কৌশল তুলে ধরছে। সরাসরি সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে যৌথ প্রশিক্ষণকেন্দ্র, দুর্যোগ মোকাবিলা কিংবা মানবিক সহায়তা অবকাঠামোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে বেইজিং—এমন বিশ্লেষণ রয়েছে।
এ পদ্ধতিতে চীন প্রচলিত সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সঙ্গে যুক্ত কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিরোধ এড়িয়ে কৌশলগত সুবিধা অর্জন করতে পারে। অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের (এএসপিআই) জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক র্যাচেল ভ্যান্ডেনব্রিঙ্ক রয়টার্সকে বলেছেন, বান কিউন নিয়ে চীনের পদক্ষেপের পেছনে সুস্পষ্ট সামরিক প্রয়োজনের চেয়ে অনুকূল সুযোগ কাজে লাগানোর বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আঞ্চলিক ভারসাম্যে নতুন চ্যালেঞ্জ
চতুর্থত, চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দীর্ঘদিনের ভারসাম্য রক্ষার কৌশলকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। এ অঞ্চলের অনেক দেশ চীনের উৎপাদনশক্তি ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে আসছে।
কিন্তু চীনের সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক উপস্থিতি বাড়তে থাকলে এই ভারসাম্য বজায় রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ভিয়েতনামসহ প্রতিবেশী দেশগুলোকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সামরিক নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের মধ্যে নতুন করে সমন্বয় করতে হতে পারে।
সব মিলিয়ে, লাওসে বান কিউন বিমানঘাঁটি প্রতিষ্ঠা কেবল চীন-লাওস সামরিক সহযোগিতার বিষয় নয়; বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। এই স্থাপনা ভবিষ্যতে কীভাবে ব্যবহৃত হয় এবং এর সামরিক সক্ষমতা কতটা সম্প্রসারিত হয়, তার ওপরই আঞ্চলিক নিরাপত্তায় এর প্রকৃত প্রভাব অনেকাংশে নির্ভর করবে।
