বেলুচিস্তানে দারিদ্র্য ও ঋণের দুষ্টচক্রে কৃষিশ্রমিকরা
ঢাকা এজ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১১:৪১ পিএম, ২১ অক্টোবর ২০২৬ বুধবার
পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে দারিদ্র্য, ঋণ ও সীমিত কর্মসংস্থানের কারণে কৃষিশ্রমিকদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে শোষণমূলক শ্রমব্যবস্থার মধ্যে আটকে রয়েছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ফসলহানি এবং চিকিৎসার ব্যয় তাঁদের আর্থিক সংকট আরও গভীর করছে। অনেক ক্ষেত্রে এই ঋণের বোঝা পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও চাপিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
বেলুচিস্তানের নাসিরাবাদ জেলার তাম্বু এলাকার কৃষিশ্রমিক মিয়ান দাদের জীবন এই সংকটেরই একটি উদাহরণ। শৈশব থেকেই তিনি ট্রাক্টর চালিয়ে জমি চাষের কাজে যুক্ত। গ্রামের এক জমিদারের জমিতে ট্রাক্টর চালানোর সহকারী হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল। বর্তমানে নিজেই ট্রাক্টর চালান। তবে মাসে তাঁর আয় মাত্র ১৪ হাজার পাকিস্তানি রুপি, যা প্রদেশটির নির্ধারিত ৩৭ হাজার রুপি ন্যূনতম মজুরির অর্ধেকেরও কম।
মিয়ান দাদ জানান, চাষাবাদের ব্যস্ত মৌসুমে তাঁকে দিনে টানা ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। অর্থাৎ প্রচলিত আট ঘণ্টার কর্মদিবসের দ্বিগুণ সময় শ্রম দিতে হয় তাঁকে। সহকারী হিসেবে কাজ করার তুলনায় বর্তমানে আয় অনেক বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি। কিন্তু ১১ সন্তানসহ পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণের জন্য এই অর্থ যথেষ্ট নয়।
তিনি বলেন, ‘মৌসুমের বাইরে আমরা টুকটাক কাজ খুঁজি কিংবা খাবারের বিনিময়ে শ্রম দিই। তাতেও কাজ না হলে ভিক্ষা করতে হয়।’
দারিদ্র্যের গভীর খাদে বেলুচিস্তান
পাকিস্তান ইকোনমিক সার্ভে ২০২৫-২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, বেলুচিস্তানের প্রায় ৪৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করেন। দেশটির জাতীয় পর্যায়ে এই হার ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
প্রদেশটির গ্রামীণ জেলাগুলোতে দারিদ্র্যের প্রকোপ আরও বেশি। এসব এলাকার অধিকাংশ মানুষের জীবিকা কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা পপুলেশন কাউন্সিলের ২০২৫ সালের ‘ডিস্ট্রিক্ট ভালনারেবিলিটি ইনডেক্স ফর পাকিস্তান’ শীর্ষক গবেষণায় দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি জেলার মধ্যে বেলুচিস্তানের ১৭টি জেলার নাম উঠে এসেছে।
নাসিরাবাদ জেলার অবস্থাও উদ্বেগজনক। বেলুচিস্তানের ৩১টি জেলার মধ্যে ঝুঁকির বিচারে জেলার অবস্থান ১১তম এবং দেশব্যাপী মূল্যায়ন করা ১২৯টি জেলার মধ্যে ১৩তম।
প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষের বসবাস তাম্বু এলাকায় কৃষিই প্রধান জীবিকা। সেখানে কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন উপজাতীয় নেতা, জমিদার, মধ্যস্বত্বভোগী, কৃষক, ট্রাক্টরচালক, কারিগর ও বর্গাচাষিরা। এই ব্যবস্থায় মিয়ান দাদের মতো শ্রমিকেরা সবচেয়ে নিচের স্তরে অবস্থান করেন। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও কম মজুরির বিনিময়ে তাঁদের জমি চাষ করতে হয়।
স্থানীয়ভাবে এসব শ্রমিকের অনেককে ‘বেগার’ বলা হয়। শব্দটি ঐতিহাসিকভাবে বিনা পারিশ্রমিকে জোরপূর্বক শ্রম আদায়ের একটি প্রথার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা ব্রিটিশ শাসনামলে উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, এমনকি দেশীয় রাজ্যগুলোতেও প্রচলিত ছিল।
বর্তমান বেলুচিস্তানে বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাব, ঋণসংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা এবং উপজাতীয় ও সামাজিক সম্পর্কের চাপে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
ঋণের বোঝায় আটকে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম
কৃষিশ্রমিকদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটিয়ে এই শ্রমব্যবস্থার নিচের স্তর থেকে উঠে আসতে অনেক সময় কয়েক দশক লেগে যায়।
নাসিরাবাদের ছাত্তার এলাকার বাসিন্দা কাদির নাসিব জানান, তাঁর পরিবার কয়েক প্রজন্ম ধরে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। দীর্ঘদিন তাঁদের পরিবারের বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা ছিল না। সম্প্রতি নিজের কুঁড়েঘরের কাছে একটি নলকূপ স্থাপন করেছেন তিনি।
কাদির বলেন, ‘নলকূপ বসানোর আগে পরিবারের নারীরা কাপড় দিয়ে পানি ছেঁকে পান করার উপযোগী করতেন।’
স্থানীয় গবেষক মুহাম্মদ নওয়াজ খোসার মতে, কৃষিশ্রমিকদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ার অন্যতম কারণ ঋণের দুষ্টচক্র। দৈনন্দিন খরচ মেটানোর পাশাপাশি যে জমিতে তাঁরা কাজ করেন, সেই জমির চাষাবাদের ব্যয় বহন করতেও অনেক পরিবারকে সুদভিত্তিক ঋণ নিতে হয়।
নিজের ‘বেলুচিস্তান কি নেহরি জারাআত’ বা বেলুচিস্তানে খালনির্ভর কৃষি শীর্ষক বইয়ে খোসা লিখেছেন, অনেক কৃষক বর্গাচাষি হিসেবে কাজ করেন। এ ব্যবস্থায় উৎপাদন পরিচালনা ও চাষাবাদের খরচ বহনের দায়িত্ব থাকে কৃষকের ওপর। এসব ব্যয়ের জন্য অনেক সময় জমিদারের মধ্যস্বত্বভোগী বা ‘বোথার’-এর কাছ থেকে ঋণ নিতে হয় তাঁদের।
ফসল কাটার পর উৎপাদিত শস্য জমির মালিক ও বর্গাচাষির মধ্যে ভাগ করা হয়। কৃষক নিজের অংশের ফসল বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করেন। কিন্তু ফসল উৎপাদনে লাভ না হলে ক্ষতির বোঝা বহন করতে হয় কৃষককেই। এতে ঋণ পরিশোধের পরিবর্তে দেনার পরিমাণ আরও বাড়তে থাকে।
এ ধরনের চুক্তিতে পোকামাকড়ের আক্রমণ কিংবা বন্যার মতো অনিবার্য দুর্যোগের বিষয়টিও যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। ফসল নষ্ট হলেও জমিদারের ঋণ পরিশোধের দায় থেকে মুক্তি পান না বর্গাচাষিরা। খোসার লেখায় উঠে এসেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে জমিদারের ‘হুজরা’ বা অতিথিদের আপ্যায়নের ব্যবস্থার খরচও কৃষকদের বহন করতে হয়। এ প্রথার শিকড় রয়েছে ওই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক ব্যবস্থায়।
মিয়ান দাদও এমন পরিস্থিতির শিকার। ২০২২ সালের বন্যার পর তাঁকে ২ লাখ পাকিস্তানি রুপি ঋণ নিতে হয়েছিল, যা তাঁর ১৪ মাসেরও বেশি সময়ের বেতনের সমান। ঋণ পরিশোধের চেষ্টা চলার মধ্যেই পরিবারের একজনের চিকিৎসার জরুরি প্রয়োজন দেখা দেয়। বাধ্য হয়ে আবারও ঋণ নিতে হয় তাঁকে।
এখন ঋণের এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে না পেরে উদ্বিগ্ন মিয়ান। তাঁর আশঙ্কা, বর্তমান ঋণের বোঝা পরবর্তী প্রজন্মকেও বহন করতে হতে পারে।
এখনো রয়ে গেছে জোরপূর্বক শ্রমের অবশেষ
উপজাতীয় পরিবার থেকে আসা গবেষক আসাদ বেলুচের মতে, বেলুচিস্তানের কিছু এলাকায় উপজাতীয় ও সামন্ততান্ত্রিক অভিজাতদের পরিবার এবং জমিদারির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমব্যবস্থায় এখনো ঋণনির্ভর বা জোরপূর্বক শ্রমের কিছু চর্চা টিকে আছে।
তিনি বলেন, আগের প্রজন্মের তুলনায় নাসিরাবাদে এ ধরনের প্রথা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে প্রদেশটির কিছু এলাকায় এর অবশিষ্ট রূপ এখনো দেখা যায়।
আসাদ বেলুচের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে উপজাতীয় নেতারা শুধু সাংস্কৃতিক নেতৃত্বই দেন না; অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা স্থানীয় অর্থনৈতিক ক্ষমতারও নিয়ন্ত্রক। দরিদ্র উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর অনেকে বেঁচে থাকা, নিরাপত্তা ও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য তাঁদের ওপর নির্ভরশীল।
কিছু গ্রামে এমন প্রথাও রয়েছে, যেখানে প্রতিটি পরিবার থেকে একজন সন্তানকে উপজাতীয় নেতার অধীনে কাজ করতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁদের সামান্য মজুরিতে নিরাপত্তারক্ষী কিংবা গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে হয়।
সীমিত কর্মসংস্থান, শিক্ষার সুযোগের অভাব এবং বিকল্প জীবিকার সংকটের কারণে এসব মানুষের পক্ষে দীর্ঘদিনের এই নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।
বন্যায় কারও মুক্তির সুযোগ, কারও ঋণ আরও গভীর
২০১০ সালের বন্যা নাসিরাবাদের কৃষিশ্রমিক ও জমিদারদের সম্পর্কেও পরিবর্তন এনেছিল। কোয়েটার সরকারি ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক ড. আবিদ মীর বলেন, ওই বন্যায় ব্যাপক কৃষিজ ক্ষয়ক্ষতির কারণে কিছু জমিদারের নিয়মিত শ্রমিক ধরে রাখার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, ‘ব্যাপক কৃষিক্ষতির কারণে কিছু জমিদারের পক্ষে আগের মতো শ্রমিকদের ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়। ফলে অনেক কৃষক পরিবার অন্যত্র কাজ খুঁজতে শুরু করে।’
এর ফলে কিছু পরিবার নিজেদের শর্তে কাজ করার সুযোগ পায়। পাশাপাশি সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করার সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
তবে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়েনি। ড. মীরের মতে, গ্রামে থেকে যাওয়া পরিবারগুলোকে ফসলহানি, আয় কমে যাওয়া এবং ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা সামলাতে হয়েছে। যেসব পরিবার আগে থেকেই আর্থিক সংকটে ছিল, তাদের কাছে নতুন করে ফসল নষ্ট হওয়া কিংবা বন্যার অর্থ হলো বেঁচে থাকার জন্য আবারও ঋণ নেওয়া।
একই দুর্যোগ কোনো পরিবারকে জমিদারের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দিতে পারে, আবার অন্য কোনো পরিবারকে আরও গভীর ঋণের ফাঁদে ঠেলে দিতে পারে।
মিয়ান দাদের মতো কৃষিশ্রমিকদের জন্য দুর্যোগের পর ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ কিংবা আবার জমিতে কাজে ফেরাই পুনরুদ্ধারের শেষ ধাপ নয়। তাঁদের ঋণ শোধ করতে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে। আর সেই ঋণের বোঝা একসময় সন্তানদের কাঁধেও এসে পড়বে—এই আশঙ্কাই তাঁদের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
