প্যারিসসহ ফ্রান্সের কয়েকটি শহরে আংশিক কারফিউ জারি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত : ১২:৫১ পিএম, ২০ অক্টোবর ২০২৬ মঙ্গলবার

ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে সপ্তাহান্তের সহিংস বিক্ষোভের পর প্যারিসের কিছু এলাকাসহ কয়েকটি শহরে আংশিক কারফিউ জারি করা হয়েছে। বিক্ষোভ সামাল দিতে পুলিশ কিছু এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল বলে স্বীকার করেছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অন্যদিকে, জনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু।

সোমবার জরুরি মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর লেকর্নু বলেন, জনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট এলাকায় সীমিত সময়ের জন্য কারফিউ জারি করা হবে। তবে পুরো শহরজুড়ে কারফিউ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।

প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর জানায়, সোমবার ও মঙ্গলবার রাত ৮টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত উত্তর ফ্রান্সের চারটি শহরে আংশিক কারফিউ কার্যকর থাকবে। এর মধ্যে লিল শহরও রয়েছে। প্যারিসে সোমবার রাত ১১টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত প্লাস দ্য লা রিপাবলিক ও লে আল এলাকায় কারফিউ জারি করে পুলিশ। শনিবার ওই দুই এলাকায় দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। কারফিউ চলাকালে সেখানে জমায়েত ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত এলাকাগুলোতে প্রবেশ ও অবস্থানেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

ফ্রান্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মার্সেইও সোমবার সব ধরনের জমায়েত ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করেছে। এদিকে দেশটির শ্রমিক সংগঠনগুলো আগামী ৫ নভেম্বর নতুন করে ধর্মঘট ও সমাবেশের ডাক দিয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ সোমবার স্বীকার করেন, শনিবারের বিক্ষোভের সময় কয়েকটি শহরে পুলিশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল। বিক্ষোভের আগে পরিস্থিতি সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা না থাকা এবং কিছু এলাকায় পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন না করাকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

নুনেজ জানান, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় দুই লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিতে পারেন বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির একাংশ সহিংসতায় রূপ নেয়, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে দেশটির অন্যতম বড় অস্থিরতার ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়।

ঘটনার দায় নিয়ে নুনেজ প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন। তবে মাখোঁ তা গ্রহণ করেননি। বরং বিক্ষোভের প্রস্তুতি ও গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি খতিয়ে দেখে নিরাপত্তাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

দেশজুড়ে প্রায় ৬০ হাজার পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হলেও প্যারিস, মার্সেই ও লিয়নের মতো বড় শহরে সংঘবদ্ধ সহিংস বিক্ষোভকারীদের সামাল দিতে তা যথেষ্ট ছিল না বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ফরাসি রেডিওকে তিনি বলেন, শত শত দোকানে লুটপাটের পর দোকানমালিকদের সামনে দাঁড়িয়ে পুলিশ পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হারায়নি—এ কথা বলা সম্ভব নয়।

কর্তৃপক্ষের হিসাবে, সহিংসতার সময় দেশজুড়ে প্রায় দুই হাজার দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। একটি নগর ভবনসহ কয়েকটি সরকারি স্থাপনাও হামলার শিকার হয়েছে এবং কোথাও কোথাও আগুন দেওয়া হয়েছে। বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁর বরাত দিয়ে ফরাসি সংবাদমাধ্যম লিবারাসিওঁ জানিয়েছে, সহিংসতা শুরুর পর থেকে ২ হাজার ৫১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ৬৭ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। প্রায় এক হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমের সদস্য আহত হয়েছেন।

ফ্রান্সে কয়েক সপ্তাহ ধরে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলছে। এসব কর্মসূচিতে কখনো কখনো পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে অসন্তোষের মধ্যে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে দেশটিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

প্যারিসের মেয়র ইমানুয়েল গ্রেগোয়ার বলেন, রোববার রাজধানীতে প্রায় ৩০টি দোকান হামলার শিকার হয়েছে এবং রাতভর আরও ৩৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার মতে, জনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, আর চলতি সপ্তাহান্তে সেই দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান