মৃত্যুদণ্ড বহাল, পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তে সমালোচনা
ঢাকা এজ ডেস্ক
প্রকাশিত : ০১:০৫ এএম, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ সোমবার
পাকিস্তানের খ্রিষ্টান নাগরিক কায়সার আইয়ুবের (৪৯) বিরুদ্ধে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননার অভিযোগে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন তাঁর আইনজীবীরা। একই মামলায় তাঁর ছোট ভাই আমুন আইয়ুবকে (৪৬) খালাস দেওয়ায় একই প্রমাণের ভিত্তিতে দুই ভাইয়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন রায় কীভাবে দেওয়া হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
গত ৭ অক্টোবর কায়সারের আপিল খারিজ করে দেন সুপ্রিম কোর্ট। পাকিস্তান পেনাল কোডের ২৯৫-সি ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ভিত্তিতে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। এ ধারায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি অবমাননাকর বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।
কায়সার ও আমুন পাকিস্তানের লাহোরের বাসিন্দা। ২০১১ সালে কায়সারের নামে নিবন্ধিত একটি ওয়েবসাইটে কথিত অবমাননাকর বিষয়বস্তু প্রকাশের অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ২০১৮ সালে দুই ভাইকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
তবে কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক কায়সার দাবি করে আসছেন, তিনি ২০০৯ সালেই ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে এক মুসলিম পরিচিত ব্যক্তি ওয়েবসাইটটি পুনরায় চালু করেন এবং কপিরাইটের তথ্য হিসেবে কায়সারের নাম রেখে দেন।
দুই ভাইকে আইনি সহায়তা দেওয়া সংস্থা সেন্টার ফর লিগ্যাল এইড, অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যান্ড সেটেলমেন্টের (ক্লাস) পরিচালক নাসির সাঈদ আদালতের সিদ্ধান্তকে ‘বিধ্বংসী’ বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, একই মামলায় এক ভাইয়ের বিরুদ্ধে উপস্থাপিত প্রমাণ যথেষ্ট না হওয়ায় তাঁকে খালাস দেওয়া হলে, একই প্রমাণের ভিত্তিতে অন্য ভাইকে কীভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায়? তাঁর মতে, এ সিদ্ধান্ত বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
নাসির সাঈদ জানান, দুই ভাইয়ের দণ্ডাদেশের পেছনে জব্দ করা একটি ল্যাপটপ থেকে পাওয়া ডিজিটাল প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এ ধরনের প্রমাণের সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ে সর্বোচ্চ মানদণ্ড অনুসরণ করা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কায়সারের জীবন রক্ষায় সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি। পাশাপাশি পাকিস্তানের ধর্ম অবমাননাসংক্রান্ত আইনের অপব্যবহার রোধে সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদার এবং মিথ্যা অভিযোগে কাউকে ফাঁসানোর ঘটনায় অভিযোগকারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
১৬ বছরের কারাবাসের দায় কে নেবে?
দুই ভাইয়ের দীর্ঘ আইনি লড়াই ও কারাবাসের মানবিক মূল্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তাকারী সংগঠন ‘ভয়েসেস ফর দ্য ভিকটিমস অব ব্লাসফেমি বিজনেস গ্রুপ’।
এক বিবৃতিতে সংগঠনটি প্রশ্ন তুলেছে, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর আমুন আইয়ুব খালাস পেলেও তাঁর জীবনের ১৬টি বছর কে ফিরিয়ে দেবে?
বিবৃতিতে বলা হয়, ন্যায়বিচারকে শুধু চূড়ান্ত রায়ের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা যায় না। দীর্ঘ কারাবাসের মানবিক মূল্য, মিথ্যা অভিযোগে জড়িয়ে পড়ার পরিণতি, পরিবারের দুর্ভোগ এবং জীবনের হারিয়ে যাওয়া বছরগুলোকেও বিবেচনায় নিতে হবে।
ধর্ম অবমাননা আইন নিয়ে উদ্বেগ
পাকিস্তানে ধর্ম অবমাননাসংক্রান্ত আইন ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটানোসহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে মিথ্যা অভিযোগ দায়েরের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে দেশটির দণ্ডবিধির ২৯৫-সি ধারায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকায় আইনটির প্রয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
যদিও এ ধারায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে, এখন পর্যন্ত এ আইনের অধীনে কারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ থেকে খালাস পাওয়া খ্রিষ্টানদেরও মুক্তির পর নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে হয়। আদালতের রায় মেনে নিতে অনিচ্ছুক উগ্রপন্থীদের হামলার আশঙ্কায় তাঁদের অনেককে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হতে হয়।
কায়সার আইয়ুবের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার সিদ্ধান্ত পাকিস্তানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার, বিচারপ্রক্রিয়ায় ডিজিটাল প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা এবং ধর্ম অবমাননাসংক্রান্ত আইনের অপব্যবহার রোধের প্রশ্নগুলোকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
