লাওসে সামরিক ঘাঁটি: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাড়ছে বেইজিংয়ের প্রভাব
ঢাকা এজ ডেস্ক
প্রকাশিত : ০১:০৫ এএম, ৯ অক্টোবর ২০২৬ শুক্রবার
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মূল ভূখণ্ডে নিজেদের নিরাপত্তা ও সামরিক উপস্থিতি আরও গভীর করছে চীন। এর অংশ হিসেবে লাওসে একটি নতুন সামরিক প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিকস কেন্দ্র চালু করেছে বেইজিং। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে বিদেশে চীনা বিমানবাহিনীর জন্য প্রথম স্থায়ী ধরনের ঘাঁটি তৈরির সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
লাওসের রাজধানী ভিয়েনতিয়েনের উত্তরে বান কুন বিমানবন্দরে গত মাসের শেষ দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে চীন-লাওস যৌথ সহায়তা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। একই সময়ে চালু করা হয় চীন-লাওস ফ্রেন্ডশিপ এভিয়েশন একাডেমি।
চীনের দাবি, কেন্দ্রটির মূল উদ্দেশ্য লাও বিমানবাহিনীর পাইলটদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। এটি দুই দেশের সামরিক বাহিনী যৌথভাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে।
চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নতুন প্রতিষ্ঠান দুটি কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়নি। বরং দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর করা এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় অবদান রাখাই এর উদ্দেশ্য।
তবে সামরিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি চীনের একটি স্থায়ী সামরিক ঘাঁটিতে রূপ নিতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার লোই ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কর্মসূচির পরিচালক হান্টার মার্সটন বলেন, কেন্দ্রটির অবকাঠামো ভবিষ্যতে চীনকে এর সামরিক ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ দিচ্ছে। তাঁর মতে, বর্তমানে যৌথ প্রশিক্ষণই মূল লক্ষ্য হলেও ভবিষ্যতে এটি আরও স্থায়ী ঘাঁটিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বেইজিং চাইলে ভিয়েনতিয়েনের ওপর থাকা রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে একচেটিয়া প্রবেশাধিকারও চাইতে পারে।
বিদেশে চীনের সামরিক স্থাপনা এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত। ২০১৭ সালে আফ্রিকার হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলের জিবুতিতে প্রথম বিদেশি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে চীন। এ ছাড়া কম্বোডিয়ার রিয়াম নৌঘাঁটির সম্প্রসারণে চীনের অর্থায়ন রয়েছে। গত বছর ওই ঘাঁটির সম্প্রসারিত অংশ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। দক্ষিণ চীন সাগরের কাছাকাছি কৌশলগত অবস্থানের কারণে রিয়াম চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
লাওস ও কম্বোডিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক অংশীদারদের মধ্যে অন্যতম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উভয় দেশের সঙ্গে চীনের সামরিক সহযোগিতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ঋণ ও বিনিয়োগে চীনের ওপর নির্ভরশীল লাওস
গত দুই দশকে চীনা বিনিয়োগ ও অর্থায়নের ওপর লাওসের নির্ভরতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সমালোচকেরা দীর্ঘদিন ধরে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে ‘ঋণের ফাঁদ কূটনীতি’র অভিযোগ করে আসছেন।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবে, গত বছর লাওসের সরকারি ঋণ ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৮১ শতাংশ। দেশটির দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতাদের মধ্যে চীনই সবচেয়ে বড়।
২০২০ সালে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান চায়না সাউদার্ন পাওয়ার গ্রিড লাওসের বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্কের বড় অংশ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইলেকট্রিসিতে দ্য লাওস ট্রান্সমিশন কোম্পানির প্রায় ৯০ শতাংশ অংশীদারত্ব অধিগ্রহণ করে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত নির্ভরতার পাশাপাশি লাওসে দীর্ঘমেয়াদি চীনা সামরিক উপস্থিতি বেইজিংয়ের কৌশলগত প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নতুন মাত্রা
লাওসে স্থায়ী চীনা সামরিক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠিত হলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বেইজিং ও ওয়াশিংটনের কৌশলগত প্রতিযোগিতায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রবেশাধিকার এখনো চীনের তুলনায় অনেক বেশি। ফিলিপাইন, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে সামরিক জোট ও ঘাঁটির মাধ্যমে ওয়াশিংটন বিস্তৃত উপস্থিতি ধরে রেখেছে।
অন্যদিকে, বিদেশে সামরিক স্থাপনার ক্ষেত্রে চীন ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে ছিল। তবে লাওসের বান কুন এবং কম্বোডিয়ার রিয়াম ঘাঁটি বেইজিংয়ের সেই ঘাটতি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে পারে। এসব স্থাপনা থেকে চীনা বাহিনী প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে সামরিক সরঞ্জাম ও রসদ মজুতের সুযোগ পেতে পারে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ ভিয়েতনামে
লাওসে চীনের নতুন সামরিক স্থাপনা সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করতে পারে প্রতিবেশী ভিয়েতনামের মধ্যে। অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো ইউয়ান গ্রাহামের মতে, বিষয়টি হ্যানয়ের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকে আরও জটিল করে তুলবে।
চীন ও ভিয়েতনামের মধ্যে দলীয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও দক্ষিণ চীন সাগরে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের ভূখণ্ড ও সামুদ্রিক সীমা নিয়ে বিরোধ রয়েছে।
একই সঙ্গে লাওস ও কম্বোডিয়াকে ভিয়েতনাম ঐতিহাসিকভাবে তার পশ্চিমাঞ্চলীয় কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাফার অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। দেশ দুটি নিজেদের প্রভাব বলয়ের মধ্যে রাখতে হ্যানয় কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে সক্রিয় ছিল।
গ্রাহামের ভাষায়, ভিয়েতনাম দীর্ঘদিন ধরে ইন্দোচীন উপদ্বীপকে বাইরের শক্তির বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত বাফার হিসেবে দেখে এসেছে। কিন্তু এখন চীনের মাধ্যমে পুরো অঞ্চল ঘিরে ফেলার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
তাঁর মতে, লাওসে নতুন বিমানঘাঁটি ভিয়েতনামের জন্য চীনের সম্ভাব্য কৌশলগত ঘেরাওয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত এবং এটি হ্যানয়ের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
