গণতন্ত্রের সুরক্ষায় সামরিক আধিপত্য যে কারণে বিপজ্জনক

ঢাকা এজ ডেস্ক

প্রকাশিত : ০৯:১৬ এএম, ৭ অক্টোবর ২০২৬ বুধবার

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মই হয়েছিল এক সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক রায় রক্ষার লড়াই থেকে। ১৯৭০-এর নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের দল আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। তার পরিণতি ছিল গণহত্যা ও রাষ্ট্রভাঙন। অর্ধশতাব্দী পরে পাকিস্তানের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশটির সেই রোগ সারেনি, বরং আরও গভীরে শিকড় গেড়েছে। এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য একটি গভীর সতর্কসংকেত।

পুরো বিষয়টি বুঝতে হলে খুব সংক্ষেপে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।  পাকিস্তানে সাংবিধানিক সামরিক আধিপত্য কায়েম হয় 'হাইব্রিড' শাসন থেকে। পাকিস্তানে তিনটি সফল অভ্যুত্থান (১৯৫৮, ১৯৭৭, ১৯৯৯) মিলিয়ে প্রায় তিন দশক সরাসরি সামরিক শাসন চলেছে। বাকি সময়েও সেনাবাহিনী পর্দার আড়াল থেকে পররাষ্ট্র, নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মূল সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করেছে। ফলে দেশটির ইতিহাসে কোনো নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। জনপ্রিয় নেতারা ক্ষমতায় এসেছেন সেনাবাহিনীর আশীর্বাদে, বিদায়ও নিয়েছেন তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙার পর। সর্বশেষ ইমরান খানের উত্থান, অপসারণ ও কারাবাস তারই সাম্প্রতিকতম দৃষ্টান্ত।

২০২৫ সালের নভেম্বরে এই প্রক্রিয়া এক নতুন পর্যায়ে পৌঁছায়। পাকিস্তানের পার্লামেন্ট একটি সাংবিধানিক সংশোধনী পাস করে, যা সেনাপ্রধানকে আজীবন আইনি দায়মুক্তি দেয়, তাঁর ক্ষমতা বাড়ায় এবং সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা খর্ব করে; বিরোধী দল একে গণতন্ত্রের সলিলসমাধি বলে আখ্যা দেয়। এই সংশোধনী 'চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস' নামে নতুন সাংবিধানিক পদ তৈরি করে, যা সেনাপ্রধান একযোগে ধারণ করবেন; এর ফলে তিনি বিমান ও নৌবাহিনী প্রধানদের ওপর প্রাধান্য পাবেন এবং পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার ব্যবস্থাপনাকারী স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানস ডিভিশনের ওপর পূর্ণ কমান্ড পাবেন। চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই বিল ২০১৮ সাল থেকে চলে আসা 'হাইব্রিড' বেসামরিক-সামরিক শাসনকেই আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

দেশটিতে সামরিক প্রভাব যখন বাড়ে, প্রথম আঘাত আসে বিচার বিভাগের ওপর, কারণ স্বাধীন আদালতই ক্ষমতার জবাবদিহির শেষ আশ্রয়। ২৭তম সংশোধনী সাংবিধানিক মামলার জন্য একটি নতুন ফেডারেল কনস্টিটিউশনাল কোর্ট প্রতিষ্ঠা করে, যা কার্যত সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা কমিয়ে দেয়; অথচ এই সুপ্রিম কোর্টই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারের নীতি আটকে দিয়েছে এবং ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীদের অপসারণ করেছে। নতুন আদালতের বিচারক নিয়োগ দেবে সরকার। প্রতিবাদে সুপ্রিম কোর্টের দুজন বিচারপতির পর লাহোর হাইকোর্টের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতিও পদত্যাগ করেন, একে সংবিধান ও বিচার বিভাগের ওপর আঘাত বলে অভিহিত করে।

নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ২০২৩ সালের ৯ মে ইমরান খানের গ্রেপ্তারের পর সহিংসতায় অভিযুক্ত বেসামরিক নাগরিকদের সামরিক আদালতে বিচার করা হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে সুপ্রিম কোর্ট এ বিচারকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করলেও, ২০২৫ সালের মে মাসে সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ দুজন বিচারপতির ভিন্নমত সত্ত্বেও ওই বেসামরিক নাগরিকদের সামরিক আদালতে বিচারের অনুমতি দেয়। আন্তর্জাতিক জুরিস্টস কমিশন (ICJ) ১০৫ জন বেসামরিক নাগরিকের সামরিক বিচার পরীক্ষা করে দেখেছে যে এসব বিচার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনগত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করে। সুতরাং শিক্ষা এখানে স্পষ্ট—সামরিক আধিপত্য শুধু সরকারকে নয়, রাষ্ট্রের প্রতিটি ভারসাম্য রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানকে ক্রমশ অধীন করে ফেলে। দীর্ঘমেয়াদে এর ফল অস্থিতিশীলতা—ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন, দুর্বল রাজনৈতিক দল, জবাবদিহিহীন নীতি এবং বারবার অর্থনৈতিক সংকট ও আন্তর্জাতিক ঋণনির্ভরতা।
পাকিস্তানের মতো দেশগুলো ভুলে যায় সেনাবাহিনীর কাজ প্রতিরক্ষা, প্রশাসন দখল নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন তাঁর ধ্রুপদি গ্রন্থ দ্য সোলজার অ্যান্ড দ্য স্টেট-এ দেখিয়েছেন, পেশাদার সামরিক বাহিনীর শক্তি তার বিশেষায়িত দক্ষতায়: যুদ্ধ, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা। রাজনীতিতে জড়ালে সেই পেশাদারিত্বই ক্ষয়ে যায়। কারণগুলো কাঠামোগত।

প্রথমত, সেনাবাহিনী গড়ে ওঠে শৃঙ্খলা ও কমান্ডের একমুখী শৃঙ্খলে; গণতন্ত্র চলে বিতর্ক, আপস ও জনমতের ভিত্তিতে। একটি ব্যবস্থার যুক্তি অন্যটিতে চাপালে ভিন্নমত হয়ে দাঁড়ায় 'শৃঙ্খলাভঙ্গ'। দ্বিতীয়ত, সেনাবাহিনী ভোটারের কাছে জবাবদিহি করে না; ফলে নীতি ব্যর্থ হলে তাকে সরানোর শান্তিপূর্ণ পথ থাকে না। তৃতীয়ত, অর্থনীতিতে সামরিক অংশগ্রহণ স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে। পাকিস্তানি গবেষক আয়েশা সিদ্দিকা তাঁর মিলিটারি ইনকর্পোরেটেড গ্রন্থে দেখিয়েছেন, সেনা-নিয়ন্ত্রিত ফাউন্ডেশন ও ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য কীভাবে সামরিক বাহিনীকে একটি স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক শ্রেণিতে পরিণত করেছে, যার স্বার্থরক্ষা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অন্যতম চালিকাশক্তি। ২০২৩ সালে গঠিত বিশেষ বিনিয়োগ সহায়তা পরিষদে (SIFC) সেনাপ্রধানের অন্তর্ভুক্তি সেই প্রবণতারই সম্প্রসারণ।

অধ্যাপক আকিল শাহ তাঁর দ্য আর্মি অ্যান্ড ডেমোক্রেসি গ্রন্থে যুক্তি দিয়েছেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিজেকে 'জাতির অভিভাবক' মনে করার যে প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাস লালন করে, সেটিই বারবার হস্তক্ষেপকে ন্যায্যতা দেয়। পাকিস্তান দেখিয়ে দিয়েছে, একবার এই মনোভাব প্রতিষ্ঠিত হলে তা উপড়ে ফেলা অত্যন্ত কঠিন। সুতরাং এই পর্যকেবক্ষণ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত তাত্‌পর্যপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশ এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। কার্নেগি এনডাওমেন্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৯৭১ সাল থেকে বাংলাদেশে ২৯টি অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ও বিদ্রোহের রেকর্ড রয়েছে, এবং ১৯৭৫ সালের আগস্ট ও নভেম্বর, ১৯৮২ ও ২০০৭ সালে চারটি সফল ক্ষমতা দখল ঘটেছে। জিয়াউর রহমান ও এরশাদের সামরিক শাসন, এবং ২০০৭-০৮ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের 'মাইনাস টু' প্রকল্প দেখিয়েছে যে 'দুর্নীতি দমন' বা 'স্থিতিশীলতা'র নামে আসা হস্তক্ষেপও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রকৌশলে পরিণত হয়।

যদিও ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করেনি; অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের পথে এগিয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৯টিতে জয়ী হয় এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হন। অবশ্য বাংলাদেশের সংবিধানে ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি আছে। পঞ্চম সংশোধনী মামলায় (২০১০) সুপ্রিম কোর্ট সামরিক শাসনকে অবৈধ ঘোষণা করেছে, এবং অনুচ্ছেদ ৭ক অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু কাগুজে বিধান যথেষ্ট নয়। এসব ব্যাপারে কিছু স্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন। যেমন বেসামরিক নাগরিকের বিচার শুধু বেসামরিক আদালতে: পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখায়, এই দরজা একবার খুললে বন্ধ করা কঠিন। সেনাবাহিনীকে দলীয় আনুগত্যে পুরস্কৃত করলে তা একদিন রাজনৈতিক খেলোয়াড় হয়ে ওঠে। মেধাভিত্তিক, স্বচ্ছ নিয়োগই পেশাদারিত্বের রক্ষাকবচ। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোরও বিশেষ দায় রয়েছে। দলগুলো ক্ষমতায় যেতে বা প্রতিপক্ষকে দমাতে 'ছাউনির দিকে তাকানো' বন্ধ না করলে কোনো সাংবিধানিক বিধানই কাজ করবে না। ইতিহাস বলে, সামরিক হস্তক্ষেপের দরজা প্রায়ই রাজনীতিবিদরাই খুলে দেন।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সুনাম গড়ে উঠেছে তার পেশাদারিত্বের কারণে। রাজনীতির বাইরে থাকাই সেই সুনামের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ।

বস্তুত, পাকিস্তান দেখিয়েছে, সামরিক আধিপত্য হঠাৎ আসে না; আসে ধাপে ধাপে: প্রথমে 'জরুরি প্রয়োজনে' হস্তক্ষেপ, তারপর পর্দার আড়ালে নিয়ন্ত্রণ, শেষে সংবিধানে তার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। প্রতিটি ধাপে আদালত দুর্বল হয়, নাগরিক অধিকার সংকুচিত হয়, রাজনীতি ফাঁপা হয়ে যায়। বাংলাদেশ ১৯৭১-এ এই পথ প্রত্যাখ্যান করেই জন্মেছিল। এখন দায়িত্ব নির্বাচিত সরকার, বিরোধী দল, আদালত, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের: শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক বেসামরিক নেতৃত্ব এবং কার্যকর সাংবিধানিক ভারসাম্যের মাধ্যমে নিশ্চিত করা যে সেনাবাহিনী থাকবে সীমান্তে ও ছাউনিতে, আর রাষ্ট্র চলবে জনগণের ভোটে।