মহাকাশে ভারত-ইউরোপের প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার নতুন দিগন্ত
ঢাকা এজ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১২:৫৫ এএম, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সোমবার
মহাকাশ খাতে ভারত ও ইউরোপের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা—দুই-ই ক্রমেই বাড়ছে। দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার আধিপত্য থাকা এই ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের উত্থানের পর ভারত ও ইউরোপও নিজেদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন জোরদারে গুরুত্ব দিচ্ছে।
এরই অংশ হিসেবে গত ৪ সেপ্টেম্বর ভারতের শ্রীহরিকোটা থেকে জিএসএলভি-এফ১৭ রকেটে ইওএস-০৫ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয়। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো) জানিয়েছে, এটি পৃথিবীর সঙ্গে সমন্বিত কক্ষপথে পরিচালনার জন্য তৈরি ভারতের প্রথম ইমেজিং স্যাটেলাইট। ২০২১ সালের আগস্টে জিএসএলভি-এফ১০ রকেট ব্যর্থ হওয়ায় হারিয়ে যাওয়া ইওএস-০৩-এর পরিবর্তে নতুন এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয়েছে।
প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় অবস্থান করা ইওএস-০৫ -এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি একটি বিস্তৃত অঞ্চল দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণে রাখতে পারবে এবং একই এলাকায় তুলনামূলক ঘন ঘন নজর দিতে সক্ষম হবে। ফলে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, দাবানল, কৃষি পরিস্থিতি ও উপকূলীয় এলাকার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণে এর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ভারতের জন্য এর গুরুত্ব শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় সীমাবদ্ধ নয়। নিজস্ব স্যাটেলাইট, দেশীয় উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এবং নিজস্ব পর্যবেক্ষণ পরিকল্পনা করার সক্ষমতা থাকায় গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতিতে বিদেশি মহাকাশসেবা প্রদানকারীদের ওপর নির্ভরতা কমবে। বিশেষ করে নিজ ভূখণ্ড, সীমান্ত ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এটি ভারতের প্রযুক্তিগত স্বায়ত্তশাসন বাড়াবে।
অন্যদিকে ইউরোপ মহাকাশ পর্যবেক্ষণে আরও বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস কর্মসূচির আওতায় একাধিক সেন্টিনেল স্যাটেলাইট স্থল, সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণ করে। ইউরোপীয় আবহাওয়া উপগ্রহ সংস্থা ইউমেটস্যাট পরিচালনা করে মেটিওস্যাট স্যাটেলাইটগুলো। পাশাপাশি মেটিওস্যাট থার্ড জেনারেশন থেকে অবিচ্ছিন্ন আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ এবং ২০২৫ সালের জুলাইয়ে উৎক্ষেপণ করা সেন্টিনেল-৪ থেকে ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকার বায়ুদূষণ সম্পর্কে ঘণ্টাভিত্তিক তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ভারত ও ইউরোপের মহাকাশ কর্মসূচি একই ধরনের নয়। ইউরোপ রাডার, অপটিক্যাল ইমেজিং, আবহাওয়া ও বায়ুমণ্ডলীয় তথ্যকে একটি বহুজাতিক কাঠামোর মধ্যে সমন্বিত করেছে। ভারত তুলনামূলকভাবে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলছে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ সক্ষমতার বড় অংশ দেশের ভেতরেই নিশ্চিত করা যায়।
গত ১০ সেপ্টেম্বর প্যারিসে স্বাক্ষরিত একটি চিঠি বিনিময়ের মাধ্যমে ভারত ও ইউরোপের মহাকাশ সহযোগিতার কাঠামো ২০৩২ সালের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এতে মহাকাশ আবহাওয়া এবং মহাকাশ কার্যক্রমের টেকসই ব্যবস্থাপনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পৃথিবী পর্যবেক্ষণেও দুই পক্ষের সহযোগিতা নতুন নয়। ২০১৮ সাল থেকে ইউরোপীয় কমিশন ও ভারতের মহাকাশ দপ্তরের মধ্যে কোপার্নিকাস ও ভারতের নির্বাচিত বেসামরিক স্যাটেলাইটের তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা রয়েছে। এর ফলে ভারত সেন্টিনেল স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহারের সুযোগ পায় এবং ইউরোপও ভারতীয় মিশন থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করতে পারে। তবে বাণিজ্যিক উচ্চ-রেজল্যুশনের ছবি এই তথ্য বিনিময়ের আওতার বাইরে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এই সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। ইওএস-০৫ দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ দিতে পারবে। ইউরোপের রাডার, জরুরি মানচিত্র, মাল্টিস্পেকট্রাল তথ্য ও ডেটা প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতার সঙ্গে ভারতীয় স্যাটেলাইটের তথ্য যুক্ত হলে ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়ার সময় কমানো সম্ভব হতে পারে।
এর পাশাপাশি মহাকাশ নিরাপত্তার গুরুত্বও বাড়ছে। নেভিগেশন, টেলিযোগাযোগ, আবহাওয়া, লজিস্টিকস ও প্রতিরক্ষাসহ আধুনিক অর্থনীতির বহু গুরুত্বপূর্ণ খাত এখন মহাকাশনির্ভর। কক্ষপথে স্যাটেলাইটের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংঘর্ষ এড়ানো, মহাকাশে থাকা বস্তু পর্যবেক্ষণ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষার প্রয়োজনও বাড়ছে।
ভারত ও ইউরোপের আলোচনায় মহাকাশ নজরদারি, যোগাযোগ ও নিরাপত্তা ইতোমধ্যে স্থান পেয়েছে। ২৭ জানুয়ারি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ভারত-ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে দুই পক্ষ একটি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব চুক্তিতেও সই করে। যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, এতে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা শিল্প ও প্রযুক্তি, সাইবার ও হাইব্রিড হুমকি, মহাকাশ এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে সামরিক সেন্সর, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কিছু দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি দুই পক্ষের মধ্যে অবাধে বিনিময় হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত। তারপরও বেসামরিক ও বাণিজ্যিক মহাকাশ কার্যক্রমে সহযোগিতার পরিসর আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
ভারতের বড় বাজার, তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক ব্যয় এবং দ্রুত সম্প্রসারিত মহাকাশ শিল্পের সঙ্গে ইউরোপের উন্নত প্রযুক্তি, দীর্ঘদিনের পরিচালন অভিজ্ঞতা ও মহাকাশ তথ্য ব্যবহারের সক্ষমতা একে অপরের পরিপূরক হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত ও ইউরোপ নিজেদের মহাকাশ সক্ষমতায় যত বেশি স্বনির্ভর হবে, ততই পারস্পরিক সহযোগিতার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। কারণ উভয় পক্ষের লক্ষ্য অভিন্ন—নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ সক্ষমতাকে অন্য শক্তির ওপর স্থায়ী নির্ভরতা থেকে বের করে আনা। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতার মধ্যেও মহাকাশ খাত ভারত ও ইউরোপকে বৈশ্বিক কৌশলগত পরিসরে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ দিতে পারে।
