চীনে নাগরিকদের বিদেশযাত্রায় নতুন বিধিনিষেধ

ঢাকা এজ ডেস্ক

প্রকাশিত : ১২:২৮ এএম, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বুধবার

নাগরিকদের বিদেশযাত্রা ও দেশত্যাগের ওপর নতুন করে ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে চীন। নতুন নিয়মে জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ, শিল্প ও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের বিদেশযাত্রা সীমিত করার সুযোগ পেয়েছে কর্তৃপক্ষ। বিদেশে অবস্থানকালে চীনের জাতীয় নিরাপত্তা বা স্বার্থের ক্ষতি করেছেন বলে বিবেচিত নাগরিকদের সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত দেশ ছাড়তে বাধা দেওয়া যেতে পারে।

নতুন বিধিমালায় সীমান্ত কর্মকর্তাদের ‘উচ্চঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত দেশ ও অঞ্চলে ভ্রমণের বিষয়ে চীনা নাগরিকদের সতর্ক করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো কৌশলগত প্রযুক্তি খাতে কর্মরত ব্যক্তিরাও এ ধরনের বিধিনিষেধের আওতায় পড়তে পারেন। এসব খাতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার মধ্যেই নতুন নিয়ম কার্যকর হলো।

এর আগেও প্রযুক্তি খাতের কয়েকজন নির্বাহীর বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। গত মার্চে মেটা অধিগ্রহণ করা এআই প্রতিষ্ঠান Manus-এর দুই সহপ্রতিষ্ঠাতাকে চীন ছাড়তে বাধা দেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

তবে নতুন বিধিনিষেধ পুরোপুরি নতুন কোনো ব্যবস্থা নয়। চীনের সরকারি কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ওপর বেশ কয়েক বছর ধরে বিদেশযাত্রা নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। পরে এসব নিয়ন্ত্রণ সাধারণ নাগরিকদের কিছু অংশের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হয়েছে।

চীনের আনহুই প্রদেশের এক অবসরপ্রাপ্ত স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা বিবিসি চায়নিজকে জানান, প্রায় ২০১৮ সাল থেকে তার কর্মস্থলে কর্মকর্তাদের পাসপোর্ট জমা দিতে হতো। গত বছর অবসর নেওয়ার পরও তার পাসপোর্ট সাবেক কর্মস্থলের হেফাজতে রয়েছে। বিদেশে যেতে হলে কর্মীদের আবেদন করে ভ্রমণের কারণ ব্যাখ্যা করতে হতো এবং সব আবেদন অনুমোদন করা হতো না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার আবেদন পর্যটনের তুলনায় বেশি সহজে অনুমোদিত হতো।

ওই সাবেক কর্মকর্তা বলেন, বিদেশে পালিয়ে যাওয়া বা সম্পদ পাচার করা থেকে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের ঠেকানো ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস ঠেকানোও এর একটি কারণ হতে পারে।

বেইজিংয়ের একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ‘শিয়াও ওয়াং’ ছদ্মনামের এক কর্মীও বিবিসি চায়নিজকে জানান, তাদের দীর্ঘদিন ধরে পাসপোর্ট জমা রাখা এবং বিদেশভ্রমণের জন্য অনুমতি নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। ৩২ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি জানান, ব্যবস্থাপকেরা মৌখিকভাবে কর্মীদের সতর্ক করে বলেছেন, জাপানের মতো ‘সংবেদনশীল’ দেশে ভ্রমণ করা যাবে না।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর এশিয়ান ল-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক টম কেলগ নতুন বিধিনিষেধকে ‘গভীরভাবে উদ্বেগজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, এগুলো চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আমলে বাড়তে থাকা আদর্শিক নিয়ন্ত্রণের প্রতিফলন। তিনি এ পরিস্থিতিকে মাও সে তুংয়ের আমলের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

তবে চীনা সরকারের গুজব-খণ্ডন প্ল্যাটফর্ম ‘পিয়াও’ দাবি করেছে, নতুন নিয়ম সাধারণ নাগরিকদের ভ্রমণ বন্ধ করার জন্য নয়। বরং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ গন্তব্য এবং অস্বাভাবিক ভ্রমণ কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে এগুলো নেওয়া হয়েছে। প্রতারণার ফাঁদে পড়ে নাগরিকদের বিদেশে চলে যাওয়া, অবৈধ জুয়া ও অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার মতো সমস্যা মোকাবিলাও এর উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছে প্ল্যাটফর্মটি।

এদিকে, চীনা নাগরিকরা বর্তমানে নিজেদের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে কি না, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করতে পারেন না। সাধারণত সরকারি লিখিত বা মৌখিক কোনো নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জানতে পারেন না যে তার ওপর দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পাসপোর্টের জন্য আবেদন করার সময় বা বিমানবন্দর দিয়ে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করলেই বিষয়টি জানা যায়।
২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশত্যাগ নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত দেওয়ানি মামলার রায়ের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে রায় দেওয়া দেওয়ানি মামলার অনুপাত প্রায় ০.২৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭.৩ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে অনেক রায় প্রকাশ না করায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নতুন বিধিনিষেধের প্রভাব মানবাধিকারকর্মী ও বিদেশে চীনা সরকারের সমালোচনাকারীদের ওপরও পড়তে পারে। অধ্যাপক কেলগ বলেন, বিদেশে চীনা নাগরিকদের আচরণ ও বক্তব্য নিয়ন্ত্রণের জন্য এটি সরকারের আরেকটি হাতিয়ার হতে পারে। তার দাবি, কিছু ক্ষেত্রে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বা বিদেশে সরকারের সমালোচনা ঠেকাতে নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ সরাসরি পাসপোর্ট ইস্যু না করার সিদ্ধান্তও নেয়।

২৬ বছর বয়সী চীনা নাগরিক ‘পিপি’ বিবিসি চায়নিজকে জানান, ২০২৩ সালে তার পাসপোর্টের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। ২০১৯ সালের হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণেই এমনটি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। ওই বিক্ষোভের সময় তিনি হংকংয়ের কয়েকটি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারও দিয়েছিলেন। পরে চীনের মূল ভূখণ্ডে ফেরার পর রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন বলে দাবি করেন তিনি।

পিপির ভাষ্য অনুযায়ী, এক অভিবাসন কর্মকর্তা তাকে মৌখিকভাবে জানিয়েছিলেন, ‘হংকং ইস্যুর’ কারণে তাকে পাসপোর্ট দেওয়া যাবে না। তবে এ বিষয়ে তাকে কোনো লিখিত সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অভিবাসন কর্তৃপক্ষ নতুন বিধিনিষেধ নিয়ে বিবিসি চায়নিজের প্রশ্নের জবাব দেয়নি।