খনিজের সন্ধানে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে ভারত

ঢাকা এজ ডেস্ক

প্রকাশিত : ০১:৫০ এএম, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শনিবার

সবুজ জ্বালানি রূপান্তর ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। সেমিকন্ডাক্টর, স্মার্টফোন, কম্পিউটারসহ আধুনিক ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ, বায়ু বিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক যান (ইভি) ও উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে এসব খনিজের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে সরবরাহ নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের দিকে কৌশলগতভাবে নজর দিয়েছে ভারত।

সবুজ অর্থনীতির রূপান্তর ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় ভারত ইতোমধ্যে ন্যাশনাল ক্রিটিক্যাল মিনারেল মিশন চালু করেছে। এই উদ্যোগের আওতায় সৌর প্যানেল, বায়ু টারবাইনের স্থায়ী চুম্বক ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি উৎপাদনে প্রয়োজনীয় খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাডার, সোনার, গাইডেন্স সিস্টেম ও হাইপারসনিক ইঞ্জিনের মতো উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

দেশীয়ভাবে অনুসন্ধানের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতাও বাড়াচ্ছে নয়াদিল্লি। এর অন্যতম লক্ষ্য হলো সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত নির্ভরতা ও আকস্মিক সংকটের ঝুঁকি কমানো এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণে চীনের প্রভাব মোকাবিলা করা। এ প্রেক্ষাপটে উত্তর মিয়ানমারের বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের প্রতি ভারতের আগ্রহ বাড়ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিয়ানমারে বিরল মাটির খনিজ (রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট) উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য উত্থান ঘটেছে। দেশটি বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম বিরল মাটির খনিজ উৎপাদক। ফলে খনিজ সরবরাহের বিকল্প উৎস হিসেবে মিয়ানমার ভারতের কাছে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে চীন গুরুত্বপূর্ণ খনিজের রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ কঠোর করায় মিয়ানমারের মজুতকে কৌশলগত বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছে নয়াদিল্লি।

২০২৪ সাল থেকে ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে খনিজ খাতে সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে গতি পেয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জুনে দুই দেশ গুরুত্বপূর্ণ ও বিরল খনিজ, বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা গভীর করার বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়।

দুই দেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগের সম্পর্ককে ভিত্তি করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং নয়াদিল্লিতে বৈঠক করেন। উচ্চপর্যায়ের ওই আলোচনার পর জুলাইয়ে মিয়ানমারে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দুই দেশের ক্রমবর্ধমান সহযোগিতার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি জানান, বিরল মাটি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে সহযোগিতা দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

এই উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ খনিজ ও খনন খাতে নতুন করে গতি সঞ্চারের সুযোগ তৈরি করেছে। প্রযুক্তিগত বিনিময়, ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগের মাধ্যমে বিরল মাটি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ খাতে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তবে ভারতের সামনে রয়েছে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ। উত্তর মিয়ানমারের দুর্গম, পাহাড়ি ও সংঘাতপ্রবণ অঞ্চল থেকে খনিজ সম্পদ সীমান্ত পেরিয়ে পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনও পর্যাপ্ত নয়। একই সঙ্গে এসব খনিজের কিছু উৎস জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী, বিশেষ করে কাচিন ইন্ডিপেনডেন্স আর্মি (কেআইএ)-এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে এসব গোষ্ঠীর সংঘাত ভারতের জন্য খনিজ সংগ্রহ ও পরিবহনের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করছে।

এ পরিস্থিতি ভারতের জন্য শুধু বাণিজ্যিক নয়, কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে। মিয়ানমারের সামরিক প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশটির পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করতে হবে নয়াদিল্লিকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহে চীনের অতিরিক্ত প্রভাব কমাতে মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের উদ্যোগ কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে খনিজের নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন, নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত ঝুঁকির কারণে এটি ভারতের জন্য একটি ‘উচ্চ ঝুঁকি, উচ্চ সম্ভাবনা’র উদ্যোগ।

তারপরও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা কমানো এবং জ্বালানি ও প্রযুক্তির রূপান্তরে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার লক্ষ্যে মিয়ানমারের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ খাতে সহযোগিতা বাড়ানোকে কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে ভারত।