পাকিস্তানের পাঞ্জাবে আহমদি নেতাকে গুলি করে হত্যা

ঢাকা এজ ডেস্ক

প্রকাশিত : ১১:৫৩ পিএম, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শুক্রবার

পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে ৬৫ বছর বয়সী এক আহমদি নেতাকে গুলি করে হত্যা করেছে অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা। এ ঘটনায় দেশটিতে আহমদি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অব্যাহত বিদ্বেষ ও উসকানি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

আহমদিয়া সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাফদার মাহমুদ নামের ওই নেতা গত ২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মান্ডি বাহাউদ্দিন জেলার ঈদগাহ মাঠের প্রবেশপথের কাছে হামলার শিকার হন। বন্দুকধারীরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালালে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

মাহমুদ স্ত্রী ও দুই ছেলে রেখে গেছেন। আহমদিয়া সম্প্রদায়ের সদর দপ্তর রাবওয়া শহরে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

নিহতের পরিবার দাবি করেছে, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে মাহমুদকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশের কাছে দায়ের করা অভিযোগে তার ছেলে কামরান সাফদার বলেন, “আমাদের বাবার কারও সঙ্গে শত্রুতা ছিল না। আহমদিদের মধ্যে ভয়, আতঙ্ক ও ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।”

তবে মান্ডি বাহাউদ্দিন সিটি থানার তদন্ত কর্মকর্তা আফজাল আহমদ বলেন, অজ্ঞাত হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান শুরু করেছে। তিনি জানান, মাহমুদের সাম্প্রতিক দ্বিতীয় বিয়ে এবং ব্যবসায়িক লেনদেনসহ বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। ধর্মীয় কারণে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে কি না, তা এখনই নিশ্চিত হওয়ার মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই বলেও জানান তিনি।

এর আগে ২০২৪ সালের জুনে একই জেলার সাদুল্লাহপুর এলাকায় দুই আহমদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। আফজাল আহমদ বলেন, ওই ঘটনায় স্থানীয় একটি মাদ্রাসার এক কিশোর শিক্ষার্থীকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এক ধর্মীয় নেতার বক্তব্যে প্রভাবিত হয়ে ওই কিশোর আহমদিদের ‘কাফির’ বা অবিশ্বাসী মনে করত। মামলাটির বিচার চলছে এবং দোষী সাব্যস্ত হলে আসামির মৃত্যুদণ্ড হতে পারে।

পুলিশের দাবি, তেহরিক-ই-লাব্বাইক পাকিস্তানের (টিএলপি) কর্মীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অভিযানের পর ওই এলাকায় আহমদি সম্প্রদায় তুলনামূলক শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। কঠোরভাবে ধর্ম অবমাননা আইন প্রয়োগের দাবিতে সহিংস বিক্ষোভ ও প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কট্টরপন্থী দল টিএলপিকে নিষিদ্ধ করা হয়।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ ভারতে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের উদ্ভব। সম্প্রদায়টি নিজেদের মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিলেও নবুয়তের চূড়ান্ততা নিয়ে মূলধারার ইসলামের সঙ্গে তাদের মতপার্থক্য রয়েছে। পাকিস্তান ১৯৭৪ সালে সাংবিধানিকভাবে আহমদিদের অমুসলিম ঘোষণা করে। দেশটিতে তাদের ইসলামি পরিভাষা ও প্রতীক ব্যবহারের ওপরও বিভিন্ন বিধিনিষেধ রয়েছে। ২০২৩ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, পাকিস্তানে আহমদিদের সংখ্যা ১ লাখ ৬২ হাজার ৬৮৪ জন।

আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মুখপাত্র আমির মাহমুদ বলেন, চলতি বছরে পাকিস্তানে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো আহমদির হত্যার এটি প্রথম নথিভুক্ত ঘটনা। ৩ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, মান্ডি বাহাউদ্দিনসহ পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় আহমদিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্বেষ ও উসকানিমূলক প্রচারণা চলছে।

পাঞ্জাবের সংখ্যালঘু বিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সোহেল আলম হত্যাকাণ্ডকে দুঃখজনক উল্লেখ করে বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আহমদিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা কমেছে। তিনি দ্রুত হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান। তার মতে, দ্রুত বিচার এবং সংবেদনশীল জেলাগুলোতে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হলে আহমদিদের নিরাপত্তা নিয়ে আস্থা বাড়বে।

আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত হামলায় তিনজন আহমদি নিহত হন। এ ছাড়া পুলিশ হেফাজতে একজনের মৃত্যু, পাঁচটি হত্যাচেষ্টা এবং ধর্ম অবমাননা ও আহমদি-বিরোধী আইনে সম্প্রদায়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে ২৫০টি ফৌজদারি মামলা নথিভুক্ত হয়।