পাকিস্তানের প্রয়োজন নতুন সামাজিক চুক্তি

ঢাকা এজ ডেস্ক

প্রকাশিত : ০৮:১৫ পিএম, ২৯ আগস্ট ২০২৬ শনিবার

পাকিস্তান বর্তমানে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক-প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যেখান থেকে উত্তরণের জন্য একটি নতুন সামাজিক চুক্তি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। দক্ষ মানবসম্পদ, বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, তরুণ জনগোষ্ঠী, বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড এবং বিশাল সমুদ্র অর্থনীতির সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দেশটি কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক-প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে ভিত্তি করে একটি নতুন সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তানের পুনর্গঠন প্রয়োজন।

বর্তমানে দেশটি গভীর রাজনৈতিক সংকটে রয়েছে। প্রধান রাজনৈতিক নেতাদের একজন কারাবন্দি রয়েছেন এবং গত নির্বাচন নিয়ে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলেরই নানা ধরনের আপত্তি রয়েছে। নতুন সামাজিক চুক্তির আওতায় সব রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি এবং একটি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের প্রস্তাব করা হচ্ছে। এই সরকারের কোনো বিবেচনামূলক উন্নয়ন তহবিল থাকবে না। পররাষ্ট্রনীতি, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে জাতীয় সরকারকে অন্তত এক দশকের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতি বাস্তবায়নের ক্ষমতা দেওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে মন্ত্রীদের উন্নয়ন বাজেট ব্যয় কিংবা সরকারি পদ সৃষ্টি ও নিয়োগের ক্ষমতা থাকা উচিত নয়। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ এবং তাদের সদস্যদের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত নীতি প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন তদারক করা।

নতুন সামাজিক চুক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হওয়া উচিত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। গণতন্ত্রের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে উন্নয়ন বাজেট ব্যয়ের ক্ষমতা দিতে হবে। তবে এ ক্ষমতার ব্যবহার কঠোর আইন ও বিধিবিধানের আওতায় রাখতে হবে। স্থানীয় সরকারকে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত সংস্থা এবং বিচারিক প্রতিনিধিত্বসম্পন্ন জবাবদিহি কাঠামোর কাছে দায়বদ্ধ করতে হবে। দুর্নীতি কমাতে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় ই-প্রকিউরমেন্ট ও অনলাইন দরপত্র বাধ্যতামূলক করার কথাও বলা হয়েছে।

সব সরকারি নিয়োগ প্রাদেশিক ও ফেডারেল পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে সম্পন্ন করা প্রয়োজন। এ জন্য এসব কমিশনের ব্যাপক সংস্কার করতে হবে। সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের আর্থিক স্বায়ত্তশাসন, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি।

নতুন সামাজিক চুক্তিতে আমলাতন্ত্রের সংস্কারকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্রুত সেবা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে এবং আমলাতন্ত্রের কাছ থেকে বাজেট ব্যয় ও নিয়োগের ক্ষমতা প্রত্যাহার করতে হবে। পাকিস্তানের সরকারি দপ্তরগুলোতে বৈধ ও সাধারণ কাজও দীর্ঘসূত্রতার শিকার হওয়া একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। একটি ফাইল নিষ্পত্তিতে মাসের পর মাস সময় লেগে যায়। নিয়োগ ও বাজেট ব্যয়ের ক্ষমতা আমলাতন্ত্রের হাতে থাকায় মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা দুর্বল হচ্ছে এবং প্রশাসনিক অকার্যকারিতা বাড়ছে।

সামাজিক সংহতি ও সমঅধিকার নতুন সামাজিক চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত। একটি সমাজে সামাজিক সংহতি যত বেশি থাকবে, সেই সমাজের সমৃদ্ধির সম্ভাবনাও তত বাড়বে। বহুজাতিক ও বহুভাষিক ফেডারেশনে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতি পারস্পরিক সম্মানই জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি। কিন্তু পাকিস্তানে বর্তমানে সামাজিক বিভাজন ও জনগোষ্ঠীভিত্তিক সন্দেহের প্রবণতা রয়েছে। বিশেষ করে দুই বৃহৎ প্রদেশসহ বড় শহরগুলোতে বসবাসকারী পশতুনদের অনেক সময় সন্দেহের চোখে দেখা হয়। নতুন সামাজিক চুক্তিতে জনগোষ্ঠীভিত্তিক প্রোফাইলিং স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করে সবার জন্য সমান নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৪৮-এর অধীনে রাষ্ট্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের জন্য যে দায়মুক্তির বিধান রয়েছে, সেটিও পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রেসিডেন্ট ও গভর্নররা দায়িত্বে থাকাকালে বিভিন্ন ধরনের ফৌজদারি ও অন্যান্য আইনি কার্যক্রম থেকে যে সুরক্ষা পান, তা মানবাধিকার, নাগরিক মর্যাদা ও জবাবদিহির নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করা হচ্ছে। এই ঔপনিবেশিক আমলের উত্তরাধিকার এবং নির্বাহী দায়মুক্তির সংস্কার প্রয়োজন।

প্রদেশগুলোর মধ্যে এবং কেন্দ্র ও প্রদেশগুলোর মধ্যে জাতীয় অর্থ কমিশন -এর রাজস্ব বণ্টন দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধের অন্যতম কারণ। বেলুচিস্তান আয়তনের ভিত্তিতে বণ্টন ফর্মুলায় বেশি ওজন দাবি করে আসছে। অন্যদিকে সিন্ধু ও খাইবার পাখতুনখোয়া কর আদায় ও রাজস্ব উৎপাদনের ভিত্তিতে নিজেদের অংশ বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছে। একটি নতুন সামাজিক চুক্তিতে এই ভারসাম্যহীনতা দূর করে ন্যায্য ও টেকসই ফেডারেল কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।

প্রাকৃতিক সম্পদের ন্যায্য হিস্যা নিয়েও প্রদেশগুলোর অসন্তোষ রয়েছে, বিশেষ করে বেলুচিস্তানের। সংবিধানের ১৭২(৩) ও ১৫৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে গ্যাস থেকে প্রদেশগুলোর ন্যায্য অংশ নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বাস্তবে সেই দাবি এখনো পুরোপুরি পূরণ হয়নি। ১৮তম সংশোধনী এই অধিকারের স্বীকৃতি দিলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি রয়ে গেছে।

পাকিস্তানে নতুন প্রদেশ বা প্রশাসনিক ইউনিট গঠনের দাবিও দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতার পর দেশটিতে নতুন কোনো প্রদেশ সৃষ্টি হয়নি, তবে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী নতুন প্রদেশের দাবি তুলে আসছে। নতুন সামাজিক চুক্তিতে প্রশাসনিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে নতুন প্রদেশ বা প্রশাসনিক ইউনিট গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে দেশের দুর্বল অর্থনীতি নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে সক্ষম কি না, সেটিও অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।

ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈরিতার কারণে পাকিস্তান একটি নিরাপত্তাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ফলে জাতীয় নিরাপত্তা ও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর নীতিনির্ধারণী ভূমিকার প্রয়োজন রয়েছে। তবে একই সঙ্গে গণতন্ত্রের প্রকৃত চর্চাও নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক দলবদল ও ঘোড়াবেচা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ এবং সিনেটে উন্মুক্ত ভোটব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে।

একই সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন এবং বিদ্যমান দলগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে কঠোর ও কার্যকর বিধিমালা প্রয়োজন। পাকিস্তানে প্রায় ১৭০টি রাজনৈতিক দল নিবন্ধিত থাকলেও এর মধ্যে প্রায় ১৪০ থেকে ১৫০টি দলের ভোটারসংখ্যা ১০ হাজারেরও কম—যা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

সবশেষে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা নিরসনে সংলাপই সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই পথ হতে পারে। খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা অভিযান চলমান থাকলেও বিদ্রোহ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ মোকাবিলায় কেবল শক্তি প্রয়োগ দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারে না। অর্থবহ রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উদ্বেগ মোকাবিলা করাই টেকসই শান্তির পথ। তাই নতুন সামাজিক চুক্তিতে সংলাপ, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

পাকিস্তানের সামনে এখন মূল প্রশ্ন হলো—বিদ্যমান কাঠামোর সীমাবদ্ধতা নিয়ে চলবে, নাকি একটি নতুন সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পুনর্গঠন করবে। দেশের স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র, সুশাসন ও দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির জন্য দ্বিতীয় পথটিই এখন বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে।