১০০ ট্রিলিয়ন রুপি ঋণ: পাকিস্তানের জন্য কি সত্যিই উদ্বেগের কারণ?

ঢাকা এজ ডেস্ক

প্রকাশিত : ১২:৩৭ এএম, ২৬ আগস্ট ২০২৬ বুধবার

পাকিস্তানের মোট ঋণ ১০০ ট্রিলিয়ন রুপি ছাড়িয়ে যাওয়ার খবর দেশটির অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জাতীয় সংবাদমাধ্যমে বিশাল অঙ্কটি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এলেও, শুধু ঋণের মোট পরিমাণ দিয়ে পাকিস্তানের ঋণ পরিস্থিতি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ—তা নির্ধারণ করা যায় না। বরং ঋণ কত দ্রুত বাড়ছে, অর্থনীতির আকারের তুলনায় এর বোঝা কতটা, সুদ পরিশোধে সরকারের কত রাজস্ব ব্যয় হচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কেমন—এসব সূচকই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাকিস্তানের ঋণ বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন বলে দাবি করা হচ্ছে। আগের বছরগুলোতে ঋণ বৃদ্ধির গড় হার ছিল প্রায় ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ, ঋণ এখনও বাড়লেও তা দ্রুতগতিতে সঞ্চিত হওয়ার প্রবণতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

ঋণ-জিডিপি অনুপাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। প্রায় পাঁচ বছর আগে পাকিস্তানের ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৮৮ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ৬৮ শতাংশে নেমেছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়। এর অর্থ হলো, রুপির হিসাবে মোট ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকলেও অর্থনীতির মোট আকারের তুলনায় ঋণের বোঝা কমেছে।

ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও কিছুটা স্বস্তির চিত্র রয়েছে। বার্ষিক সুদ ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৮ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন রুপি থেকে কমে ৬ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন রুপিতে নেমেছে। একই সময়ে মোট সরকারি রাজস্বের মধ্যে সুদ পরিশোধের অংশ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রায় ৬১ শতাংশ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, আগে সরকারের প্রতি ১০০ রুপি রাজস্বের মধ্যে ৬১ রুপি সুদ পরিশোধে ব্যয় হলেও এখন তা প্রায় ৩৫ রুপিতে নেমেছে।

পাকিস্তানের ঋণ পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ সাড়ে তিন বছর আগে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে ১৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা মাত্র ২ দশমিক ৪ সপ্তাহের সমপরিমাণ থেকে বেড়ে প্রায় তিন মাসে উন্নীত হয়েছে। যদিও এই মজুত এখনও স্বস্তিদায়ক মাত্রার নিচে, তবু বৈদেশিক ঋণের দায় পরিশোধে পাকিস্তানের সক্ষমতা আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে।

ঋণের মোট আকারের পাশাপাশি এর মেয়াদ ও কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান প্রায় ৪ দশমিক ৭২ ট্রিলিয়ন রুপির ঋণ নির্ধারিত মেয়াদের আগেই পরিশোধ করেছে। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ ঋণের গড় মেয়াদ প্রায় ২ দশমিক ৮ বছর থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৮ বছরের বেশি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সরকারের ওপর প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ঋণ পুনঃঅর্থায়নের চাপ কমাতে সহায়তা করে।

ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি ছিল বৈদেশিক ঋণ, কারণ এ ধরনের ঋণ বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়। তবে এখানেও কিছুটা উন্নতি হয়েছে। মোট সরকারি ঋণের মধ্যে বৈদেশিক ঋণের অংশ ছয় বছর আগে প্রায় ৩৮ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে তা কমে ৩১ শতাংশে নেমেছে। তবে ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। বৈদেশিক ঋণের প্রায় এক-চতুর্থাংশ দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতাদের কাছ থেকে নেওয়া, যার একটি বড় অংশ নিয়মিত পুনঃতফসিল বা রোলওভারের প্রয়োজন হয়।

আন্তর্জাতিক বাজারে পাকিস্তানের প্রত্যাবর্তনও অর্থনীতিতে আস্থার কিছুটা পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিচ্ছে। চার বছর পর দেশটি আন্তর্জাতিক মূলধন বাজারে ফিরে এসেছে এবং ইউরোবন্ড ও পান্ডা বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করেছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলো পাকিস্তানের রেটিং উন্নীত করেছে। এসঅ্যান্ডপি পাকিস্তানের রেটিং বাড়িয়ে ‘বি’ করেছে, যা প্রায় এক দশকের মধ্যে দেশটির সর্বোচ্চ পর্যায়। তবে পাকিস্তান এখনও বিনিয়োগযোগ্য (ইনভেস্টমেন্ট গ্রেড) রেটিং থেকে অনেক নিচে রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক উন্নতিগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই করতে পারাটাই এখন পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছাতে হবে, যেখানে ঋণ দেশের উন্নয়ন ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে না এবং সুদ পরিশোধে অতিরিক্ত রাজস্ব ব্যয় হওয়ায় শিক্ষা, অবকাঠামো ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে না।

ফলে ১০০ ট্রিলিয়ন রুপির ঋণের অঙ্কটি নিঃসন্দেহে বড় এবং উদ্বেগজনক। কিন্তু পাকিস্তানের ঋণ সংকটের প্রকৃত চিত্র শুধু মোট ঋণের অঙ্ক দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বরং দেশটি কতটা দক্ষতার সঙ্গে সেই ঋণ বহন ও পরিশোধ করতে পারছে, সেটিই মূল বিষয়। সাম্প্রতিক বিভিন্ন সূচক বলছে, বহু বছর পর পাকিস্তানের ঋণ পরিস্থিতির গতিপথে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।