জামায়াতের ‘পরীক্ষিত বন্ধু’ যুক্তরাষ্ট্র, কিন্তু বাংলাদেশের নয়
ঢাকা এজ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১২:২১ এএম, ২৬ জুলাই ২০২৬ রোববার
গত ৪ জুলাই জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় মার্কিন দূতাবাস কর্তৃক আয়োজিত ‘যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা’ দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের আমীর,সংদদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. মো. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একটি ‘পরীক্ষিত বন্ধু রাষ্ট্র’। এই বক্তব্যের পর সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে প্রশ্ন জেগেছে আসলেই কি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু? তবে পরীক্ষিত বন্ধু কে বা কারা এর অর্থ বুঝাতে বলা হয়, তিনি এমন একজন বন্ধু,যার বিশ্বস্ততা ও আন্তরিকতা বিভিন্ন কঠিন পরিস্থিতিতে বা সময়ের পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে। অন্য কথায়, যিনি সুখে-দুঃখে সর্বদা পাশে থাকেন এবং সংকটের সময়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণিত হন, তিনিই পরীক্ষিত বন্ধু। সেই অর্থে যুক্তরাষ্ট্র কি আদৌ কখনো বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু ছিল?
বাংলাদেশের জন্মলগ্নে অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের সময়ই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন,পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম পি রজার্স, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের প্রশাসন পুরো নয় মাস বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বাধাগ্রস্ত করতে পাকিস্তানকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সমর্থন দিয়েছে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করে। তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী গণহত্যা বন্ধে আন্তর্জাতিক মহলকে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। অথচ সেদিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন গণহত্যা অস্বীকার করে আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন। কেবল তা-ই নয়, সে সময় বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্চার ব্লাডও মত দিয়েছিলেন যে, হত্যাযজ্ঞ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু নিক্সন প্রশাসন এ ধরনের প্রস্তাবে রাজি হয়নি,বরং পাকিস্তানের জন্য সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছিল। পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ করা হয়। সে অস্ত্র বাংলাদেশের নিরীহ মানুষের উপর প্রয়োগ করা। অর্থ দিয়ে সাহায্য করা হয়। এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বিভিন্ন দেশ সফর করে পাকিস্তানের পক্ষে দূতিয়ালি করেছে। এমনকি যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পরাজয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছিল,তখন মার্কিন সপ্তম নৌ-বহর পাঠিয়ে পাকিস্তান সহযোগিতা করার ঘোষণা দিয়েছিল। যদিও রাশিয়ার অষ্টম নৌ-বহর পাঠানোর হুমকিতে সে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো অর্থ ও অস্ত্রের পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাত ধরে এদেশের জামায়াতে ইসলামীর হাতেও পৌঁছে যায়।জামায়াত এসব অর্থ ও অস্ত্রের সদ্ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় এদেশের মানুষের উপর নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালায়। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের বিপক্ষে হত্যা, নির্যাতন, নারী ধর্ষণের কাজে পাকিস্তান ও তার এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আল-শামসকে সহায়তা করেছে। তাই জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পেয়েছে।
স্বাধীনতার পরও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ-বিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল।
বাংলাদেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করলেও দেশটিকে নিয়ে খুবেই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়। হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলেন। এদেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই বলে মন্তব্য করেন। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের জন্য খাদ্য সাহায্যের আবেদন করা হলে মার্কিন প্রশাসন খাদ্য সাহায্যের বিনিময়ে যুদ্ধপরাধের অভিযোগে আটক ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনাকর্মকর্তাকে ছেড়ে দেয়ার শর্ত আরোপ করেন।
বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে অকৃত্রিম বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল ফিদেল কাস্ত্রোর দেশ কিউবা। ১৯৭৩ সালে জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে বঙ্গবন্ধু আলজিয়ার্স যান এবং কিউবা বাংলাদেশের পাট রফতানির সিদ্ধান্ত নেন। তখন আমেরিকার সাথে কিউবার শীতল সম্পর্ক বিরাজ করেছিল। কিউবার সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্কের অজুহাতে তখন আমেরিকার পিএল ৪৮০ এর গম ভর্তি জাহাজ ফিরিয়ে নেয়া হয়। যার কারণে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের বড় ধরনের দুর্ভিক্ষে মানবিক বিপর্যয় নেমে আসে। দুর্ভিক্ষে সরকারি হিসেবে প্রায় চল্লিশ হাজার এবং বেসরকারি তথ্যমতে, অনাহার, অপুষ্টজনিত কারণে প্রায় পনের লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়।
মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের (রাজাকার,আলবদর, আলশামস) বিচারের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আনুষ্ঠানিক ও সরাসরি বিরোধিতা না করলেও কৌশলে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে। ২০১০ সালে গঠিত বাংলাদেশের 'আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল'-এর বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আন্তর্জাতিক মান ও আসামিদের অধিকার রক্ষার বিষয়ে বিভিন্ন সময় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম, সাক্ষীদের নিরাপত্তা ও আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কিছু মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল যে,এই বিচারের মাধ্যমে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে (বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী) দমন করা হচ্ছে কি না? তাই তারা একটি সর্বজনীন ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেয়ার কথা বলেছিল। সবই ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।বিচার প্রকৃয়াকে বিতর্কিত ও জামায়াত নেতাদের বাঁচানোই তাদের লক্ষ্য ছিল।
গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একদম শেষ সময়ে বাংলাদেশের সাথে একটি বাণিজ্য চুক্তি করে যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় সকলেই বলছেন, এটা কোনো চুক্তি নয়, যুক্তরাষ্ট্রের দাসত্ব গ্রহণ করা। কারণ একটি আদর্শ বাণিজ্য চুক্তির মূল শর্ত হওয়া উচিত পারস্পরিক সুবিধা ও সমতা। কিন্তু এই চুক্তির পাতায় পাতায় বশ্যতা স্বীকার করা হয়েছে। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট বেশকিছু পণ্য কেনার বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ করা হয়েছে। যেমন: বাংলাদেশকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ, ১৫ বছরে ১,৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের তেল কিনতে হবে। প্রতি বছর ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলারের কৃষিপণ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হবে। মার্কিন সামরিক পণ্য ক্রয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। কিছু নির্দিষ্ট দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় সীমিত রাখতে হবে। মার্কিন পণ্যে কোনো কোটা আরোপ করা যাবে না এবং অশুল্ক বাধা দূর করতে হবে। মার্কিন পণ্যের সঙ্গে দেশীয় পণ্য প্রতিযোগিতায় সুবিধাজনক অবস্থায় না পড়ে তা নিশ্চিত করতে হবে।যুক্তরাষ্ট্রের সুতা দিয়ে তৈরি পোশাকে পাল্টা শুল্ক না বসানোর প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। চুক্তির এই সকল শর্তাবলির কারণে বাংলাদেশের স্বাধীন বাণিজ্য নীতি প্রণয়নের ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। গার্মেন্টস শিল্প গুলো ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রতি বছর ৩৫০ কোটি ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানির বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের কৃষি, ডেইরি ও পোলট্রি খাতে বিপর্যয় ডেকে আনবে। দেশের খাদ্য মূল্যের দাম অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যাবে,মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির মতে, এই চুক্তি কার্যকর হলে প্রতি বছর বাংলাদেশ সরকার প্রায় ১,৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে।
সর্বশেষ ২০২৪ গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে সুবিধাভোগী দল হলো জামায়াতে ইসলামী। কারণ গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছিল মুলত পরোক্ষভাবে জামায়াতে ইসলামীরই সরকার। আর এখন তো স্বীকৃত বিরোধী দলের মর্যাদা নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠার পর থেকে এমন সুসময় আর কখনো আসেনি। এখানেও সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরই অবদান।এখন তো দিবালোকের মতো স্পষ্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় বাংলাদেশের ক্ষমতার ‘রেজিম চেঞ্জ’ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যখন বলেছিল, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি শক্তিশালী করতে (রেজিম চেঞ্জ) একটি প্রকল্পে ২৯ মিলিয়ন (দুই কোটি ৯০ লাখ) ডলার দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র সরকার। এই অর্থ এমন একটি প্রতিষ্ঠানে গেছে যেটির নাম কেউ কখনো শোনেনি।তখনও কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবিরা এই বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল।কিন্তু এখন তো গণঅভ্যুত্থানকারী নেতা-নেত্রীরা প্রকাশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের ডীপ ষ্টেটের কথা সগর্বে বলেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জামায়াতে ইসলামী লাভবান হয়েছে, বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই জামায়াতের পরীক্ষিত বন্ধু যুক্তরাষ্ট্র, তবে কোনো ভাবেই বাংলাদেশ নয়।
