বাংলাদেশে মৌলবাদীদের পুনরুত্থান ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ
ঢাকা এজ প্রতিবেদক
প্রকাশিত : ০২:৩০ পিএম, ৩০ মে ২০২৬ শনিবার
ছবি : প্রতীকী
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সভাপতি হিসাবে তারেক রহমান বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ যাতে চরমপন্থী ও মৌলবাদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠতে না পারে, সেই প্রত্যাশা করে বিএনপি। এজন্য সবাইকে সোচ্চার থাকতে হবে।’ কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশে মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের যে দাপট শুরু হয়েছিল সেটা কিন্তু এখনও নির্মূল হয়নি। অনিয়ন্ত্রিত কওমি মাদ্রাসার মাধ্যমে শিশুমনেও ঢোকানো হচ্ছে মৌলবাদী ও জিহাদি চিন্তাধারা। ধর্মীয় শিক্ষার নামে চলছে শুধু বাংলাদেশকেই নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়াকে অস্থির করে তোলার কর্মকাণ্ড।
জামায়াতে ইসলামসহ বিভিন্ন মৌলবাদী সংগঠনের মদদে বাংলাদেশে বাড়ছে মৌলবাদ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যেও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সাম্প্রদায়িক বিভেধের বিষবাস্প। অনিয়ন্ত্রিত কওমি মাদ্রাসার নামে ধর্মীয় শিক্ষা মৌলবাদী শক্তিগুলোকে করে তুলছে আরও শক্তিশালী। বিদেশি জঙ্গিবাদীরাও তাদের প্রভাব বিস্তার করছে বাংলাদেশে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনামলে বাংলাদেশ হয়ে উঠেছিল মৌলবাদের অভয়রাণ্য। কট্টর জঙ্গিরা জেল থেকে বেরিয়ে এসে শুরু করে দিয়েছিল তাদের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী সেই জঙ্গিরা এখনও অনেকে কারাগারের বাইরে রয়েছে। ফলে বিপদ কিন্তু বাড়ছে। জঙ্গিবাদী ও মৌলবাদীদের আসল উদ্দেশ্যই হচ্ছে ইসলামী শাসনের নামে বাংলাদেশে অস্থিরতা সৃষ্টি।
সম্প্রতি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এক ওয়ারেন্ট অফিসারের সন্ধান মেলে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) এক ডেরায়। এখনই সাবধান না হলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতে পারে। অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে উগ্রবাদের বিস্তার। আর জঙ্গিবাদীদের আঁতুর ঘরই হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত কওমি মাদ্রাসা।
ছাত্র-জনতা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শক্তিকে পরাস্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু সেই আন্দোলনে কূফল, ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থান। বিভিন্ন স্থানে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে শুরু হয় মৌলবাদের প্রসার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নারীদের পোশাক এবং চলাফেরার স্বাধীনতাসহ প্রগতিশীল চিন্তাধারার ওপর রক্ষণশীলতা ও অসহিষ্ণুতার প্রভাব দেখা গিয়েছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপাসনালয়, বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর আক্রমণ এবং তাদের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার বিভিন্ন ঘটনাই প্রমাণ করে মৌলবাদীরা এখনও কতোটা সক্রিয়। তারা চাইছে নির্বাচিত সরকারকে বিপাকে ফেলতে।
ফ্যাসিবাদী শক্তির পতনের পর নিরাপত্তা ব্যবস্থার শূন্যতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী পুনরায় সংগঠিত হয়েছে। ফলে বৃদ্ধি পেয়েছে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও মৌলবাদী শক্তির তৎপরতা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সামাজিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন চরমপন্থী রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক গোষ্ঠী সমাজে তাদের প্রভাব বিস্তার করছে। লক্ষ্য করা যাচ্ছে কওমি মাদ্রাসার অতিসক্রিয়তাও।
কওমি মাদ্রাসার সমর্থক ও আলেমরা বলে থাকেন, তাদের মূল লক্ষ্য ইসলামি অনুশাসন, কুরআন ও হাদিসের বিশুদ্ধ জ্ঞান সংরক্ষণ করা। তারা নাকি মৌলবাদকে প্রশয় দেন না। বরং ইসলামের প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের প্রদান করেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে দেওবন্দি ধারার কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় ব্যাখ্যার আড়ালে উগ্র মতবাদে শিক্ষার্থীদের ধর্মান্ধ করে তোলা হচ্ছে। বহু কওমি আলেম ও সংগঠন ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করছেন। দেশে ধর্মীয় শাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে প্ররোচনা দিচ্ছেন তারা।
কওমি মাদ্রাসার পাঠ্যক্রম আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার ঠিক উল্টো। শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী করে তুলতেও অক্ষম। তাই শিক্ষার্থীরা ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল ও বৈচিত্র্যময় সমাজের বদলে অন্ধবিশ্বাসের ফাঁদে পরছে। বহু জায়গায় কওমি মাদ্রাসাগুলো ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার বদলে ধর্মীয় উগ্রবাদ ও মৌলবাদী শক্তিকে উসকে দিচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, মৌলবাদ হচ্ছে নির্দিষ্ট ধর্মীয়, আদর্শিক বা রাজনৈতিক মতবাদের কঠোর আক্ষরিক ব্যাখ্যা এবং এর অন্ধ অনুসরণ। এরফলে সমাজে অসহিষ্ণুতা, মেরুকরণ এবং চরমপন্থা তৈরি হয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর এর প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ধ্বংসাত্মক। তরুণ সম্প্রদায়ের মানসিক বিকাশ, দেশের স্বাধীনতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মৌলবাদীদের হাতে। প্রশ্ন করার স্বাধীনতা লোপ পায়। শৈশব অন্ধবিশ্বাসের বেড়াজালে আটকে পড়ে। তাদের বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছিল ইসলামী সংগঠনগুলির হাতের পুতুল। মৌলবাদীরা বলেছিল, স্কুলে সঙ্গীত এবং নৃত্য শেখানো 'ইসলামবিরোধী'। তাই তাদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সঙ্গীত এবং শারীরশিক্ষার প্রশিক্ষন দেওয়া শিক্ষকের পদ বাতিল করা হয়েছিল।
মৌলবাদীদের হাত ধরেই বাংলাদেশে বাড়ছে জঙ্গিবাদ। লস্কর-ই-তৈয়বা (এলআইটি) ও জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) মতো সংগঠনগুলো বিভিন্ন কওমি মাদ্রাসায় তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তার করছে। সম্প্রতি পাকিস্তানভিত্তিক তেহরিক-ই-তালেবান (টিটিপি)-এর মতো জঙ্গিগোষ্ঠীরও বাংলাদেশে সন্ধান মিলেছে। গড়ে উঠছে তেহরিক-ই-বাংলাদেশ। এছাড়াও ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে পালিয়ে অনেক দুর্ধর্ষ জঙ্গি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কারাগার ভেঙে পালানো ২০২ জন বন্দির মধ্যে ১৩৩ জনই এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে ঝুঁকি কিন্তু বাড়ছে।
মৌলবাদী ও জঙ্গিবাদীরা চায় সন্ত্রাস কায়েম করে বাংলাদেশকে অস্থির করে তুলতে। নির্বাচিত সরকারের প্রতি তাদের বিন্দুমাত্র আস্থা নেই। তাদের পিছনে রয়েছে বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের হাত। নির্বাচিত সরকারের উচিত মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদকে কঠোর হাতে সমূলে নির্মূল করা। না হলে বিপদ বাড়বে বিএনপি সরকারেরও। ধর্মীয় অপব্যাখ্যার মাধ্যমে বেকারত্ব, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে দেশ এবং বিদেশ থেকে উগ্র মতাদর্শের প্রচার কিন্তু চলছে পুরোদমে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য এই প্রবণতা বিপজ্জনক।
