চীনের কড়াকড়িতে তিব্বতি নির্বাসনের সংখ্যা তলানিতে
ঢাকা এজ ডেস্ক
প্রকাশিত : ০১:২৬ এএম, ২৬ মে ২০২৬ মঙ্গলবার
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে হিমালয় পেরিয়ে ভারত ও নেপালে পালিয়ে আসা তিব্বতিদের সংখ্যা ছিল তিব্বতের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, চীনের কঠোর নজরদারি ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের কারণে সেই প্রবাহ এখন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
ভারতের ধর্মশালাভিত্তিক তিব্বতি নির্বাসিত প্রশাসন বা সেন্ট্রাল টিবেটান অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (সিটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে ১২ হাজারের বেশি তিব্বতি নির্বাসনে যেতে সক্ষম হলেও গত পাঁচ বছরে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৮১ জনে।
বিশ্লেষকদের মতে, তিব্বতের ওপর বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ জোরদার হওয়ায় স্বাধীন তথ্যপ্রবাহও কমে যাচ্ছে। ফলে ধর্মীয় বিধিনিষেধ, ভাষানীতি কিংবা গ্রামীণ পুনর্বাসনের মতো বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও অস্বচ্ছ হয়ে উঠছে।
২০১০ সালে তিব্বত ছেড়ে যাওয়া মধ্যবয়সী তিব্বতি লোবসাং ডয়চে ভেলেকে বলেন, “২০০৮ সালের পর থেকে তিব্বতে নিরাপত্তা কাঠামো পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন প্রতিটি গ্রাম, মঠ ও পরিবারকে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য সীমান্তে পৌঁছানোই প্রায় অসম্ভব।”
২০০৮ সালের বিক্ষোভের পর কঠোরতা বৃদ্ধি
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৮ সালে বেইজিং অলিম্পিকের আগে তিব্বতে ছড়িয়ে পড়া ব্যাপক বিক্ষোভের পর থেকেই নির্বাসনের সংখ্যা দ্রুত কমতে শুরু করে। ওই সময় চীনা কর্তৃপক্ষ কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং পরবর্তীতে তিব্বতজুড়ে ডিজিটাল নজরদারি, পুলিশি তৎপরতা ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হয়।
তবে চীনা সরকার দাবি করে, তিব্বতে অবকাঠামো উন্নয়ন, নগরায়ণ ও দারিদ্র্য হ্রাসের ফলে মানুষের জীবনমান উন্নত হয়েছে, তাই দেশত্যাগের প্রবণতা কমেছে।
দিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (ওআরএফ) গবেষক অতুল কুমার বলেন, “তরুণ তিব্বতিরা এখন বড় বড় চীনা শহরে গিয়ে অর্থনৈতিক সুযোগ গ্রহণে আগ্রহী।”
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, উন্নয়নের পাশাপাশি তিব্বত ও শিনজিয়াং অঞ্চলে চলাচল, ধর্মীয় কর্মকাণ্ড ও যোগাযোগের ওপর নিয়ন্ত্রণও বেড়েছে।
নেপালের অবস্থানেও পরিবর্তন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তিব্বতি নির্বাসনের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে নেপালের ভূরাজনৈতিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
একসময় তিব্বত-নেপাল সীমান্ত ছিল ভারতগামী তিব্বতিদের প্রধান রুট। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মধ্যস্থতায় নেপাল অনানুষ্ঠানিকভাবে তাদের নিরাপদ যাত্রার সুযোগ দিত।
কিন্তু চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে নেপালে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ার পর কাঠমান্ডু এখন বেইজিংয়ের নীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে অবস্থান নিচ্ছে।
নেপাল সরকার বারবার “এক চীন নীতি” সমর্থনের কথা জানিয়েছে এবং তাদের ভূখণ্ডে “চীনবিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড” করতে না দেওয়ার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
অতুল কুমারের ভাষায়, “আজ থেকে ২০ বছর আগের তুলনায় সীমান্ত পার হওয়া এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অনেক কঠিন। ২০০৮ সালের পর থেকে চীন কাঠমান্ডুর ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। ফলে সীমান্তে নজরদারি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।”
তিনি জানান, নেপালের সীমান্ত পুলিশ ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। ড্রোন, সিসিটিভি ও ইলেকট্রনিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্বাসনে যেতে চাওয়া তিব্বতিদের শনাক্ত করা হচ্ছে।
সংকটে তিব্বতি সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ
নতুন নির্বাসিতদের আগমন দীর্ঘদিন ধরে তিব্বতি স্কুল, মঠ, সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং ধর্মশালাভিত্তিক নির্বাসিত সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
ভারতভিত্তিক এক তিব্বতি শিক্ষাবিদ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নির্বাসিত সম্প্রদায় শুধু স্মৃতির ওপর টিকে ছিল না, বরং তিব্বতের সঙ্গে মানুষের ধারাবাহিক যোগাযোগের মাধ্যমেও টিকে ছিল।”
