বাংলাদেশকে অস্থির করার চক্রান্তে লিপ্ত জঙ্গিরা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত : ০৩:০৮ পিএম, ৮ মে ২০২৬ শুক্রবার
বাংলাদেশে জঙ্গি তপরতা বাড়ছে। মৌলবাদীদের হাত ধরে জঙ্গিরা জাতির নিরাপত্তার জন্য ভয়ঙ্কর ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে। দেশের স্থিতাবস্থাও বিঘ্নিত হতে পারে। ফের বাংলাদেশকে অস্থির করার চক্রান্তে লিপ্ত দেশবিরোধী শক্তি। বিদেশি গণমাধ্যমেও বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী কার্যকলাপ নিয়ে উদ্বেগ ধরা পড়েছে।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি এবং জার্মানির ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে তেহরিক ই তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) বাংলাদেশে তাদের শাখা খুলেছে। তেহেরিক ই বাংলাদেশ বা টিটিবি নামে নতুন জঙ্গি সংগঠনের বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করে দিয়েছেন অনেকে। জামায়াতের মদদপুষ্ট অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই জঙ্গিবাদ বেশি মাথা চাড়া দেয় বলে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন।
বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর ফের চর্চায় উঠে এসেছে জঙ্গি কার্যকলাপ। সম্প্রতি কামরাঙ্গীরচর ও কেরাণীগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মো. ইমরান চৌধুরী (২৯), মো. মোস্তাকিম চৌধুরী (২৫), রিপন হোসেন শেখ (২৮) ও আবু বক্কর (২৫) নামে তিন কট্টর জঙ্গিকে। তাদের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, ড্রোন ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে৷ তারা নিষিদ্ধ সংগঠন ‘আকসা'র সক্রিয় সদস্য। বিভিন্ন স্থানে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ও হামলার পরিকল্পনায় জড়িত ছিল বলে জানা গিয়েছে। তাদের সঙ্গে টিটিপির যোগাযোগের তথ্যও পেয়েছেন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জঙ্গি ততপরতা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশে জঙ্গীরা সংগঠিত হতে পেরেছে। আমরা তাদের দমন করব’। জঙ্গিদের সক্রিয়তা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, ‘সরকার এটাকে শূন্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে’৷
তিনি স্বীকার করেন, ‘এটা ফ্যাক্ট, বাংলাদেশে জঙ্গি আছে৷ কিন্তু এখানে দুটো এক্সট্রিম (চরমপন্থা) আছে, আমি দুটো এক্সট্রিমের কথা বলি৷ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জঙ্গি সমস্যা যেই স্কেলে দেখানো হয়েছে, এটা তাদের ক্ষমতায় থাকার একটা ন্যারেটিভ হিসেবে তারা ব্যবহার করেছিলেন যে বাংলাদেশে জঙ্গি আছে, জঙ্গিরা সব দখল করবে৷ আবার অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই আলাপ কেউ কেউ করার চেষ্টা করেছেন যে, বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নেই৷ এটাও আরেকটা এক্সট্রিম, এটাও ভুল কথা৷ বাংলাদেশে একটা পর্যায়ে মিলিট্যান্সি, জঙ্গিবাদ ছিল, আছে৷ সেটাকে আমরা আসলে কমব্যাট করতে চাই’৷ জঙ্গি ততপরতা প্রতিরোধে গোটা দেশেই সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানিয়েছেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সম্ভাব্য জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় রাজধানীর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ মোট আটটি বিমানবন্দরে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্র উদ্ধৃত করে ডয়েচে ভেলে জানিয়েছে, বাংলাদেশে ১ হাজার ৬১১ জঙ্গির নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে৷ এই জঙ্গিদের বেশিরভাগ বিভিন্ন সময় জামিনে মুক্ত হয়েছে৷ তালিকা অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এক হাজার ২৩১ জন জঙ্গি জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে৷ আর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত জামিন পেয়েছে আরো ৩৮০ জন৷ এই ৩৮০ জনের মধ্যে সাতজন আনসার আল ইসলাম, চারজন এবিটি, ৬৮ জন জেএমবি, ছয়জন নব্য-জেএমবি, ছয়জন হিযবুত তাহরীর, চারজন ইমাম মাহমুদের কাফেলা, চারজন হুজি, ১৫ জন জেএএফএইচএস এবং ২৬৫ জন নাম-উল্লেখ না থাকা সংগঠনের সদস্য৷ এর মধ্যে ১১৪ জন জামিন পাওয়ার পর থেকে আর কখনো আদালতে হাজিরা দেননি৷ আবার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় অভিযুক্ত অন্তত ৩৭০ জন জঙ্গি এখনো গ্রেপ্তার হয়নি৷ বাংলাদেশে জুলাই আন্দোলনের সময় বহু জঙ্গিবাদী জেল থেকে পালান। লুট হয় বহু অস্ত্র। সেই অস্ত্র এখনও পুরোপুরি উদ্ধার হয়নি। জঙ্গিবাদীরা এখনও অনেকে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বাংলাদেশের ১৬টি কারাগারে গত বছরের জুন পর্যন্ত ১৬২ জন জঙ্গি বন্দি রয়েছে৷ এর মধ্যে বিচারাধীন আছে ৩২ জন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫৯ জন, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ৪৬ জন ও অন্যান্য ২৫ জন৷ এছাড়া ২০২৪ সালের আগস্টে কারাগার ভেঙে পালিয়ে যাওয়া জঙ্গিদের মধ্যে ৭৯ জনকে এখনও ধরা যায়নি৷ এদের মধ্যে ৯ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত৷ জঙ্গিবাদীদের সঙ্গে পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের যোগাযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকে বাংলাদেশে নিজেদের ঘাঁটি শক্ত করতে ব্যস্ত। বর্তমান সরকার জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিলেও এখনও পুরোপুরি ঝুঁকি কমেনি।
বাংলাদেশ পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের মিডিয়া বিভাগের পুলিশ সুপার মাহফুজুল আলম রাসেল বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এই ধরনের তৎপরতার বিষয়গুলো সামনে আসলেও এখনই বড় কোনো হামলার আশঙ্কা তারা দেখছেন না। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী বিভিন্ন সংগঠনের তৎপরতা অনেক বছর আগে থেকেই ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেটি আরো বেশি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তাদের অনেকেই জেল থেকে মুক্তিও পেয়েছে।
সম্প্রতি পুলিশের একটি চিঠি প্রকাশ্যে এসেছে। সেই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘সম্প্রতি গ্রেফতারকৃত নিষিদ্ধঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ ওরফে সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদের সাথে চাকরিচ্যুত দুই জন সেনা সদস্যের নিয়মিত যোগাযোগের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। তারা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহে (জাতীয় সংসদ, বাংলাদেশ পুলিশ/সেনাবাহিনীর সদস্য অথবা স্থাপনাসমূহ, ধর্মীয় উপাসনালয়, বিনোদনকেন্দ্রসমূহ, শাহবাগ চত্বর) বোমা বিস্ফোরণ এমনকি দেশীয় ধারালো অস্ত্র কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা করতে পারে মর্মে জানা যায়’।
গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জঙ্গিরা এক ধরনের স্বাধীনতা ভোগ করেছেন, স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। অনেক জায়গায় বিক্ষোভ ও কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছেন। সেখানে তারা কলেমা লেখা কালো পতাকা ব্যবহারও করেছেন। আইডেন্টিটি প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন’।
জঙ্গিবাদীরা নির্বাচিত সরকারকে উতখাত করে বাংলাদেশে ফের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চাইছে। চাইছে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে। স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি কিছুতেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক ও বাহক বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পরিচালিত সরকারকে সহ্য করতে পারছে না। তাই দেশীয় ও বিদেশি শক্তি গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
