বাংলাদেশের গভীরতর ঋণ সংকট: সামনে কঠিন সময়

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত : ১২:২২ পিএম, ২৫ এপ্রিল ২০২৬ শনিবার

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঘিরে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ আগামী কয়েক বছরে দেশের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০—এই পাঁচ অর্থবছরে বাংলাদেশকে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যয় করতে হবে প্রায় ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে যেখানে মোট ৪০ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে, সেখানে মাত্র পাঁচ বছরে তার দুই-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি অর্থ পরিশোধের এই চাপ নিঃসন্দেহে নজিরবিহীন।

গত জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৭ বিলিয়ন ডলার, যা জাতীয় আয়ের প্রায় ১৯ শতাংশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অনুপাত বাড়ছে। বর্তমানে ঋণ পরিশোধের জন্য সরকারের আয়ের ১৬.৫ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ঝুঁসীমার (১৮ শতাংশ) নিচে থাকলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ২০২৬ থেকে ২০৩৫—এই দশ বছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়াবে ৫১ বিলিয়ন ডলার। ২০৩০ সালের মধ্যে বার্ষিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ সর্বোচ্চ ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। তুলনায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাসিক প্রবাসী আয় ছিল গড়ে ২ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ এক বছরের ঋণ পরিশোধ করতে প্রায় তিন মাসের রেমিট্যান্স আয়ের সমান অর্থ প্রয়োজন হবে।

এই বিশাল ঋণচাপের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কোভিড-১৯ মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দা বাংলাদেশের রপ্তানি, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং রেমিট্যান্স প্রবাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমেছে এবং সরকারের আয়ও সীমিত হয়েছে।

দেশীয় কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কর্ণফুলী টানেল, পদ্মা রেল সংযোগ এবং শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো প্রকল্পগুলো ঋণের বোঝা বাড়িয়েছে। এসব প্রকল্পের বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে ব্যয় বেড়েছে এবং প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল পেতে দেরি হচ্ছে।

এছাড়া, বাংলাদেশের কর ব্যবস্থাও দুর্বল। জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার মাত্র ৭ শতাংশ, যা আঞ্চলিক দেশগুলোর তুলনায় কম। প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ কম হওয়ায় সরকারকে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।

একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। রপ্তানি ও রেমিট্যান্স কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমছে, যা ঋণ পরিশোধকে আরও কঠিন করে তুলছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অর্থনীতিবিদরা কয়েকটি পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছেন। প্রথমত, কর আদায় বৃদ্ধি, বিশেষ করে প্রত্যক্ষ করের পরিধি বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। দ্বিতীয়ত, রপ্তানি খাতকে বহুমুখীকরণ এবং আমদানিতে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। তৃতীয়ত, ঋণনির্ভর প্রকল্প গ্রহণে সতর্কতা এবং সময়মতো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

এছাড়া দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং বৈদেশিক আয়ের উৎস বাড়ানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ এখনো পর্যন্ত কখনো বৈদেশিক ঋণ খেলাপি হয়নি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সতর্ক না হলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, সঠিক নীতি গ্রহণ এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই ঋণ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব—কিন্তু দেরি করার সুযোগ আর নেই।