পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতার মাঝেও ভারতের অর্থনীতি দৃঢ় অবস্থানে

ঢাকা এজ ডেস্ক

প্রকাশিত : ১১:১১ এএম, ১৬ এপ্রিল ২০২৬ বৃহস্পতিবার

পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও ভারতের অর্থনীতি শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাড়লেও দেশটি স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি বজায় রেখে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতিগুলোর অন্যতম হিসেবে অবস্থান করছে। চলতি অর্থবছর ২০২৫–২৬-এ ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭.৬ শতাংশ এবং ২০২৬–২৭ অর্থবছরেও তা ৭ শতাংশের বেশি থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

গত এক দশকে গৃহীত ধারাবাহিক কাঠামোগত ও নীতিগত সংস্কার ভারতের অর্থনীতিকে আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে। ব্যবসা সহজীকরণ, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে। কোভিড-১৯ মহামারি এবং চলমান বৈশ্বিক অস্থিরতার পরও গত তিন বছর ধরে দেশটি ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকও ইতিবাচক প্রবণতা দেখাচ্ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে উৎপাদন খাতে পারচেজিং ম্যানেজার্স’ ইনডেক্স দাঁড়িয়েছে ৫৬.৯ এবং সেবা খাতে ৫৮.১—যা যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং জার্মানির মতো অর্থনীতির তুলনায় বেশি। এতে শিল্প ও সেবা খাতে ধারাবাহিক সম্প্রসারণের ইঙ্গিত মিলছে।

রপ্তানি খাতেও ইতিবাচক ধারা বজায় রয়েছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের এপ্রিল থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রপ্তানি প্রায় ৬ শতাংশ বেড়ে ৭৯১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭৪৮ বিলিয়ন ডলার। প্রকৌশল পণ্য, ইলেকট্রনিকস, রাসায়নিক, রত্ন ও গয়না এবং কৃষিপণ্য এ প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

দেশীয় চাহিদাও প্রবৃদ্ধির বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকায় এবং জ্বালানির দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় ভোক্তা ব্যয় বেড়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক ধাক্কার মাঝেও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি শক্ত ভিত্তি ধরে রাখতে পারছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করাও ভারতের একটি বড় সাফল্য। দেশটি কৌশলগত তেল মজুত গড়ে তুলেছে এবং প্রায় ৫০–৬০ দিনের জ্বালানি রিজার্ভ বজায় রেখেছে, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় বেশি। পাশাপাশি রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রাজিল ও মেক্সিকোসহ বিভিন্ন উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ ঝুঁকি কমিয়েছে।

তবে পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাত, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে হয়। এখানে কোনো বিঘ্ন ঘটলে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে, যা পরিবহন, উৎপাদন ও লজিস্টিক খাতে চাপ সৃষ্টি করবে।

এই অঞ্চলের অস্থিরতার কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলেও চাপ তৈরি হয়েছে। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে বিলম্ব এবং বিমান চলাচলে পরিবর্তনের ফলে ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিকস ও ওষুধের মতো উচ্চমূল্যের পণ্যে এর প্রভাব বেশি পড়ছে।

এ পরিস্থিতিতেও ভারতের বৈচিত্র্যময় বাণিজ্য সম্পর্ক, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ বাজার এবং সতর্ক নীতিগত পদক্ষেপ দেশটিকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রেখেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে জ্বালানি মূল্য, পরিবহন ব্যয় ও শিল্প উৎপাদনে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।

ঝুঁকি মোকাবিলায় সরবরাহ শৃঙ্খলা তদারকি জোরদার, জ্বালানি মজুত ব্যবস্থাপনা এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতকে আর্থিক সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

সব মিলিয়ে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভারতের অর্থনীতি স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির পথে রয়েছে। শক্তিশালী মৌলিক ভিত্তি, সংস্কারমুখী নীতি এবং কৌশলগত পরিকল্পনা দেশটিকে ভবিষ্যতেও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সহায়তা করবে।