চীনে ‘অত্যন্ত গুরুতর’ ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের অভিযোগ
ঢাকা এজ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১২:১১ পিএম, ২৮ মার্চ ২০২৬ শনিবার
যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন (ইউএসসিআইআরএফ) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে চীনে ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিস্থিতি “অত্যন্ত গুরুতর” অবস্থায় রয়ে গেছে। ৪ মার্চ প্রকাশিত এই বার্ষিক প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, দেশটিতে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন অব্যাহত রয়েছে এবং এই চাপ দেশের সীমানা ছাড়িয়েও বিস্তৃত হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনে ধর্মীয় কার্যক্রম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং যারা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) নির্ধারিত কাঠামোর বাইরে বিশ্বাস চর্চা করেন, তারা নানা ধরনের শাস্তির মুখে পড়ছেন। এর মধ্যে রয়েছে হয়রানি, অর্থদণ্ড, আটক, জোরপূর্বক শ্রম, রাজনৈতিক পুনঃশিক্ষা, গুম, কারাদণ্ড এবং নির্যাতন।
সব ধর্মের ওপর সমন্বিত দমন অভিযান
প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় ইউএসসিআইআরএফের ভাইস চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ বলেন, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা ধর্মীয় সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে চীনা কর্তৃপক্ষ তাদের অভিযান আরও জোরদার করেছে। কমিশনার মওরিন ফার্গুনসন এই দমন-পীড়নকে “সর্বব্যাপী” ও “পদ্ধতিগত” বলে উল্লেখ করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই দমন-পীড়ন উইঘুর মুসলিম, ফালুন গং অনুসারী, তিব্বতি বৌদ্ধ, আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাথলিক এবং স্বাধীন প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চগুলোর ওপর বিস্তৃত।
চীনের “সিনিসাইজেশন” নীতির আওতায় ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোকে রাষ্ট্রের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে বাধ্য করা হচ্ছে। যারা এই নীতি মানতে অস্বীকৃতি জানায়, তাদের ওপরই সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে।
হাউস চার্চ ও ধর্মীয় নেতাদের ওপর কঠোরতা
প্রতিবেদনে প্রোটেস্ট্যান্ট হাউস চার্চগুলোর ওপর চলমান দমন-পীড়নের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এসব চার্চ সরকারি অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত হওয়ায় সেগুলোকে বেআইনি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। উল্লেখযোগ্য এক ঘটনায়, জায়ন চার্চের প্রতিষ্ঠাতা এজরা জিন-কে কারাবন্দি করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এছাড়া বয়স্ক ধর্মীয় অনুসারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ৮৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তি ২০২৫ সালে সাড়ে তিন বছরের কারাদণ্ড ভোগ শুরু করেছেন।
ফালুন গংয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্যাতন
ফালুন গংয়ের ওপর দীর্ঘদিনের দমন-পীড়নের বিষয়টিও প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে। ১৯৯৯ সালে এই অনুশীলন নিষিদ্ধ করার পর থেকে লক্ষাধিক অনুসারী আটক ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হারবিনের অবসরপ্রাপ্ত এক শ্রমিক ৮৭ বছর বয়সে কারাদণ্ড ভোগ শুরু করেছেন। তার স্ত্রীও নির্যাতনের শিকার হয়ে ২০১৯ সালে মারা যান বলে জানা গেছে।
হংকং ও উচ্চপ্রোফাইল বন্দি
হংকংয়ের প্রেক্ষাপটেও ধর্মীয় ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ক্যাথলিক কর্মী ও মিডিয়া উদ্যোক্তা জিমি লাই-এর ২০ বছরের কারাদণ্ডের বিষয়টি প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।
সীমান্ত পেরিয়ে নজরদারি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন “ট্রান্সন্যাশনাল রিপ্রেশন” বা সীমান্তপারের দমন কৌশল ব্যবহার করছে। বিভিন্ন দেশে বসবাসরত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নজরদারি ও চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে এক মামলায় সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মাইকেল ম্যাকমোহন -কে চীনা সরকারের হয়ে অবৈধভাবে কাজ করার অপরাধে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাটি “অপারেশন ফক্স হান্ট” কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
প্রতিবেদন প্রকাশের প্রেক্ষাপটে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আসন্ন চীন সফর এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ে সঙ্গে বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
মার্কিন আইনপ্রণেতা ব্রাড শেরম্যান বলেন, ধর্মীয় স্বাধীনতা যুক্তরাষ্ট্রের মূল মূল্যবোধের অংশ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হওয়া উচিত।
অব্যাহত উদ্বেগ
সার্বিকভাবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনে ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্র পরিচালনার একটি কেন্দ্রীয় উপাদান হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর চলমান দমন-পীড়ন এবং এর আন্তর্জাতিক বিস্তার বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
