পাকিস্তানে শিশু নির্যাতন: অভিযোগ হাজারও, বিচার খুবই বিরল
ঢাকা এজ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১০:১৯ পিএম, ৯ মার্চ ২০২৬ সোমবার
পাকিস্তানে শিশু নির্যাতন একটি গভীর ও উদ্বেগজনক সামাজিক সংকট হিসেবে ক্রমেই সামনে আসছে। শারীরিক, যৌন ও মানসিক সহিংসতার পাশাপাশি শিশু শ্রম ও পাচারের মতো অপরাধও সেখানে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। আইন থাকা সত্ত্বেও দুর্বল তদন্ত, সামাজিক কলঙ্ক ও সাংস্কৃতিক বাধার কারণে অধিকাংশ ঘটনাই প্রকাশ পায় না এবং বিচারও খুব কম ক্ষেত্রেই নিশ্চিত হয়।
২০২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি এক ভয়াবহ অনলাইন শিশু শোষণ চক্রের সন্ধান পায়। রাওয়ালপিন্ডির এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তকারীরা তার ডিভাইস থেকে শিশুদের ৬০০-এর বেশি অশালীন ভিডিও উদ্ধার করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ইনস্টাগ্রামে ভুয়া নারী পরিচয়ে কিশোরদের ফাঁদে ফেলতেন, আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করতেন এবং পরে সেগুলো প্রকাশের হুমকি দিয়ে আরও ভিডিও পাঠাতে বাধ্য করতেন। তদন্তে জানা যায়, তিনি শিশু যৌন নির্যাতনের ভিডিও কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত একাধিক সহযোগীর সঙ্গেও যোগাযোগ রাখতেন।
এর কয়েক সপ্তাহ আগে করাচিতেও শিশু নির্যাতনের একটি বড় ঘটনা সামনে আসে। ২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি সুরজানি টাউন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া এক সন্দেহভাজন সিরিয়াল অপরাধীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বিভিন্ন এলাকা থেকে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী ছেলেদের অপহরণ করে যৌন নির্যাতন করতেন এবং পরে আবার ছেড়ে দিতেন। ডিএনএ পরীক্ষায় ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের অন্তত সাতটি ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। অনেক ভুক্তভোগী শিশুও তাকে শনাক্ত করেছে।
এদিকে ২০২৫ সালের জুনে পাঞ্জাবের মুজাফফরগড়ে আরেকটি শিশু পর্নোগ্রাফি চক্রের সন্ধান মেলে। একটি গেমিং ক্লাবকে কেন্দ্র করে কয়েকজন শিশু নির্যাতনের শিকার হয় এবং তাদের নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করা হতো। এক ভীত শিশুর সাহস করে অভিযোগ জানানোর পর ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে।
শিশু অধিকার সংগঠন সাহিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে পাকিস্তানে প্রতিদিন গড়ে ১২ জন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে—অর্থাৎ প্রায় প্রতি দুই ঘণ্টায় একজন। ভুক্তভোগীদের অধিকাংশের বয়স ছয় থেকে পনেরো বছরের মধ্যে এবং ছেলেশিশুর সংখ্যাই বেশি। ২০২৫ সালের তথ্যও একই ধরনের উদ্বেগজনক চিত্র দেখায়; অনলাইন শোষণ, অপহরণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে।
পাঞ্জাব প্রদেশে ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ৪,১৫০টির বেশি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সাসটেইনেবল সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন। কিন্তু এত অভিযোগের পরও সব মিলিয়ে মাত্র ১২টি মামলায় দণ্ডাদেশ হয়েছে। শুধু যৌন নির্যাতনের ৭১৭টি মামলার একটিতেও তখন পর্যন্ত কোনো সাজা হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল কারণ আইন নয়, বরং আইন প্রয়োগের ব্যর্থতা। তদন্ত প্রক্রিয়া প্রায়ই দুর্বল ও অসংগতিপূর্ণ হওয়ায় আদালতে প্রমাণ টেকে না। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের গাফিলতি ও অভিযোগ গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে অপরাধীরা বছরের পর বছর ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক নীরবতা। লজ্জা, ভয় ও পরিবারের সম্মান রক্ষার চাপের কারণে অনেক শিশু বা তাদের পরিবার অভিযোগ করতে চায় না। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে “পরিবারের সম্মান” রক্ষার যুক্তি সামনে আনা হয়, আর ছেলেরা দুর্বল মনে করা হবে—এই ভয়ে চুপ থাকে।
করাচির মউরিপুর ট্রাকস্ট্যান্ডের মতো কিছু এলাকায় শিশু শ্রমিকদের ওপর যৌন নির্যাতন ও সহিংসতা প্রায় প্রকাশ্যেই ঘটে বলে মানবাধিকারকর্মীরা অভিযোগ করেছেন। সেখানে অনেক কিশোর ড্রাইভারদের সহকারী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে নিয়মিত নির্যাতনের শিকার হয়, যা অনেক সময় ‘স্বাভাবিক’ বিষয় হিসেবে মেনে নেওয়া হয়।
শিশুদের সুরক্ষায় পাকিস্তান সরকার ২০২০ সালে জয়নাব অ্যালার্ট, রিকভারি অ্যান্ড রেসপন্স আইনসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে এবং কিছু প্রদেশে শিশু সুরক্ষা আদালত গঠন করা হয়েছে। তবে বাস্তবে এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা এখনও সীমিত।
মাঝে মাঝে কোনো ভয়াবহ ঘটনা সামনে এলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হ্যাশট্যাগে প্রতিবাদে সরব হয় মানুষ। কিন্তু জনরোষের সেই ঢেউ থেমে গেলে অধিকাংশ ঘটনাই আবার চাপা পড়ে যায়।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, পাকিস্তানে শিশুদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে হলে শুধু আইন প্রণয়ন নয়, কার্যকর তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং সামাজিক সচেতনতা—এই তিন ক্ষেত্রেই বড় পরিবর্তন আনা জরুরি।
